• সোমবার   ২৬ অক্টোবর ২০২০ ||

  • কার্তিক ১০ ১৪২৭

  • || ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

৮৬

গঠন হচ্ছে ‘ফুড ব্যাংক’

দৈনিক বগুড়া

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০  

করোনা পরিস্থিতিতে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে গঠন করা হচ্ছে আপৎকালীন ‘ফুড ব্যাংক’ বা খাদ্য ভাণ্ডার। এতে কমপক্ষে দুই বছরের জন্য খাদ্য মজুদ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

মজুদ বাড়াতে জরুরি প্রয়োজনে বিদেশ থেকেও চাল আমদানির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে অনুমোদন দেয়া আছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, আমাদের খাদ্য ভাণ্ডার এখনও পূর্ণ হয়নি। তা পর্যাপ্ত করতেই সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

জরুরি প্রয়োজনে বিদেশ থেকে চাল আমদানির আগে মন্ত্রণালয় জানতে চাচ্ছে কোন জেলায় কী পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এসব তথ্য চেয়ে সব জেলা প্রশাসককে চিঠি দেয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, অপর্যাপ্ত খাদ্য ভাণ্ডারে খাদ্যের মজুদ বাড়াতে এরই মধ্যে রাশিয়া থেকে দুই লাখ মেট্রিক টন গম আমদানি করা হয়েছে। আরও দুই লাখ মেট্রিক টন গমের জন্য এলসি খোলা হয়েছে।

দেশে বর্তমানে কী পরিমাণ খাদ্য মজুদ আছে তার সঠিক কোনো হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। বেসরকারিভাবে খাদ্য মজুদের কোনো হিসাব মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। শুধু সরকারি গুদামে ১২ লাখ মেট্রিক টন চাল রেশনিংয়ের জন্য মজুদ আছে।

খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মনে করি আপৎকালীন ২০ লাখ মেট্রিক টন চাল মজুদ রাখা উচিত। সরকারি গুদামে বর্তমানে ১৮ লাখ মেট্রিক টন চালের ধারণক্ষমতা আছে। করোনার প্রভাব দুই বছরও যদি থাকে তার জন্যও আমাদের পক্ষ থেকে নানামুখী প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। বোরো আমন ধান আমাদের ‘সাপোর্ট’ দেবে। আমাদের গমের মজুদ আছে। এক বছরে গম লাগে ৬ লাখ মেট্রিক টন। রাশিয়া থেকে ২ লাখ মেট্রিক টন কিনেছি। আরও ২ লাখ মেট্রিক টনের জন্য এলসি করেছি। আর আগের মজুদ আছে ২ লাখ মেট্রিক টন। জরুরি প্রয়োজনে বিদেশ থেকে চাল আমদানির জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে রেখেছি।’

জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আউশ ও আমন ধানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৩৬ লাখ টন ও এক কোটি ৫৫ লাখ টন। দফায় দফায় বন্যায় ফসলের ক্ষতি হলেও তা পুষিয়ে নিতে প্রায় শত কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছে সরকার।

খাদ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলাসহ সবকিছু ঠিক থাকলে দেশে খাদ্য ঘাটতি হবে না বলে দায়িত্বশীলরা আশ্বস্ত করছেন। অর্থমন্ত্রীর ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান অর্থবছরে মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ৫১ লাখ মেট্রিক টন।

বিগত বছরের উৎপাদিত ৪ কোটি ১ লাখ মেট্রিক টনের চাইতে বর্তমান অর্থবছরে প্রায় ১২.৪৭ শতাংশ বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছে।

বাংলাদেশের কৃষক সমাজ ঝুঁকি নিয়ে সম্ভাব্য খাদ্য সংকট মোকাবেলায় বরাবরের মতোই সফলতার সঙ্গে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদন করেছে।

কিন্তু এরপরও মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দফতর কতটা সফলতার সঙ্গে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের সরবরাহ ও মজুদ ব্যবস্থাপনা সম্পাদন করতে পারছে- এমন প্রশ্নের কোনো সুরাহা মিলছে না।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এ বছর ৮ লাখ মেট্রিন টন বোরো ধান, ১০ লাখ মেট্রিক টন বোরো সিদ্ধ চাল এবং দেড় লাখ মেট্রিক টন বোরো আতপ চাল সংগ্রহ করার কথা।

কিন্তু গত ৭ সেপ্টেম্বর (২০২০) পর্যন্ত বোরো ধান সংগৃহীত হয়েছে মাত্র ২ লাখ ১২ হাজার ৭৭২ মেট্রিক টন, যা লক্ষ্যমাত্রার ২৬.৬%।

বোরো সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করা হয়েছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ৮০১ মেট্রিক টন (লক্ষ্যমাত্রার ৫৯.৫%) এবং বোরো আতপ চাল সংগৃহীত হয়েছে ৮৭ হাজার ৮৮০ মেট্রিক টন (লক্ষ্যমাত্রার ৫৮.৫৮%)।

চালের আকারে যা সর্বমোট ৮ লাখ ২০ হাজার ৯৮৩ মেট্রিক টন। বিগত বছরের এই সময় পর্যন্ত মোট ১৪ লাখ ৯ হাজার ৮৮৪ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ হয়েছিল।

অর্থাৎ বিগত বছরের তুলনায় এ বছর এখন পর্যন্ত ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৯০১ মেট্রিক টন চাল কম সংগ্রহ করা হয়েছে। এই সময় পর্যন্ত খাদ্যশস্যের মোট মজুদ ১৪.০২ লাখ মেট্রিক টন।

এর মধ্যে চাল ১১.৩৬ লাখ মেট্রিক টন এবং গম ২.৬৬ লাখ মেট্রিক টন। বিগত বছরের এ সময় পর্যন্ত খাদ্যশস্যের মোট মজুদ ছিল ১৮ লাখ ৯২ হাজার ৭১০ মেট্রিক টন যার মধ্যে চালের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৩০ হাজার ৭১০ মেট্রিক টন।

অর্থাৎ বর্তমান বছরের চালের মজুদের পরিমাণ বিগত বছরের তুলনায় ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭০ মেট্রিক টন কম। বাংলাদেশে বর্তমানে খাদ্য মজুদের ধারণক্ষমতা ২০ লাখ মেট্রিক টন হলেও এখন পর্যন্ত ১২ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য মজুদ রয়েছে।

যদিও খাদ্য মজুদের গোডাউনগুলো অনেক পুরনো। ফলে একদিকে বাড়ছে মজুদকৃত খাদ্যশস্যের ক্ষতির পরিমাণ, অন্যদিকে পুষ্টিগত মানও হ্রাস পাচ্ছে।

অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন খাদ্যশস্যের মজুদ সুবিধা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়।

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. আক্তারুজ্জামান মনে করেন, বর্তমান এই কোভিড ১৯ মহামারীতে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশে খাদ্যশস্যের মজুদ সার্বক্ষণিকভাবে অন্ততপক্ষে ধারণক্ষমতার কাছাকাছি থাকা বাঞ্ছনীয়।

যার পরিমাণ ২০ লাখ মেট্রিক টন। এ বিষয়ে অতিসত্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহের কার্যক্রম জোরদার করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক (ডিজি) শাহজাহান কবীর বলেন, চালের উৎপাদন গত বছরের চেয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেড়েছে।

গত বোরো ও আমন মৌসুমের উদ্বৃত্ত ধরে জুন পর্যন্ত দেশে ২ কোটি ৩ লাখ ১০ হাজার টন চালের মজুদ ছিল। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত চাহিদা মেটানোর পরেও ৫ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন টন চাল দেশের অভ্যন্তরে উদ্বৃত্ত থাকবে।

নভেম্বর পর্যন্ত ১৬ দশমিক ৫০ কোটি মানুষের চাহিদা মেটানোর পরেও চাল ৩৬-৭৮ দিনের চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। যদিও এসব নির্ভর করছে পুরোপুরি প্রাকৃতিক পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৬৬ হেক্টর জমিতে আউশ ধান আবাদ হয়েছে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৬ লাখ ৪৪ হাজার ৮০০ টন।

আর গত বছর (২০১৯-২০) দেশের ৫৮ লাখ হেক্টর জমিতে আমনের চাষ করে ১ কোটি ৫৫ লাখ টন চাল উৎপাদন করা হয়।

আসন্ন আমন মৌসুমে আবাদি জমির পরিমাণ পাঁচ লাখ হেক্টর বাড়িয়ে করা হবে ৬৩ লাখ হেক্টর এবং তা থেকে পৌনে দুই কোটি টন চাল উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।

চলতি বছর তিন দফা বন্যায় কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে ৯৩ কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

খাদ্য ভাণ্ডারও পর্যাপ্ত হবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান বলেন, বন্যার ক্ষয়ক্ষতি পোষাতে সরকার নানা ধরনের প্রণোদনা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

ইতোমধ্যে ১৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকার কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বীজ বিতরণ করা হয়েছে। আরও প্রায় ৭৫ কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

দৈনিক বগুড়া
দৈনিক বগুড়া
জাতীয় বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর