• বুধবার   ২১ অক্টোবর ২০২০ ||

  • কার্তিক ৬ ১৪২৭

  • || ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

৪২

দরিদ্রদের প্রতি ইসলামের সম্মান

দৈনিক বগুড়া

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২০  

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

و اصبر نفسك مع الذين يدعون ربهم بالغداة و العشي يريد وجهه و لا تعد عيناك عنهم

و اصبر نفسك مع الذين يدعون ربهم بالغداة و العشي يريد وجهه 
و لا تعد عيناك عنهم تريد زينة الحيوة الدنيا

এ অয়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে, আপনি নিজেকে তাদের সঙ্গে রাখুন যারা সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর সন্তুাষ্টির উদ্দেশ্যে তার উপাসনা করে। কখনো এমন যেন না হয়, আপনার দৃষ্টি তাদের থেকে সরে পার্থিব জীবনের চাকচিক্যের প্রতি নিবদ্ধ হয়, অর্থাৎ আপনি ভাবতে থাকেন-এরা দরিদ্র ও সাধারণ প্রকৃতির লোক। তাদের প্রতি দৃষ্টিপাতের কী প্রয়োজন? আপনি সম্পদশালীদের প্রতি মনোনিবেশ করতে থাকেন।

বন্ধুসুলভ ভর্ৎসনা:  

সমস্ত কোরআনে দু’তিনটি স্থান এমন, যেখানে আল্লাহ তায়ালা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামান্য ভর্ৎসনা করে বলেন, আপনার এ কাজ আমার পছন্দ হয় না। তন্মোধ্যে একটি হলো, ‘সূরা আবাসা’। যার ঘটনাটি এমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে মুশরিকদের কতিপয় সরদার এসেছিল। 

তিনি ভাবলেন, যেহেতু তারা সরদার যদি তাদের সংশোধন হয়ে যায়, তাদের মাধ্যমে পুরো জাতির সংশোধনের পথ খুলে যাবে। এ কারণে তাদেরকে দ্বীন ইসলামের দাওয়াত দেয়ার অধিক গুরুত্ব তার অন্তরে সৃষ্টি হয়ে যায় এবং তাদের প্রতি নিবিষ্ট হয়ে যান। ইতিমধ্যেই হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম যিনি অন্ধ সাহাবি ছিলেন, যাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীর মুয়াজ্জিন নির্দিষ্ট করেছিলেন, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে এসে কোনো মাসআলা জিজ্ঞেস করেত  লাগলেন। 

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাবলেন, এ তো আমার নিজের লোক প্রতিদিন সাক্ষাত হয়, এখন তাকে মাসআলা না বলে পরে বলে দেব। তাই তিনি তাকে বললেন, তুমি একটু অপেক্ষ করো, আমি মুশরিক নেতাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় ব্যস্ত আছি, যেন তাদের ইসলাম গ্রহণের তাওফিক হয়ে যায়। কারণ যদি তারা মুসলমান হয়ে যায়, তাহরে পুরো সম্প্রদায়ের মুসলমান হওয়ার পথ খুলে যাবে। 

ব্যস, ঘটনা এতটুকুই। তবে আল্লাহ তায়ালা এর ওরপর সতর্ক করেছেন এবং এই আয়াত নাজিল করেছেন,

عبس و تولى أن جاءه الأعمى

এ আয়াতে রাসূল (সা.)-কে অনুপস্থিত শব্দে সম্বোধন করেছেন। তিনি ভ্রুকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কারণ তার কাছে অন্ধ লোকটি এসে পড়েছিল।  যেন এ কাজটি আল্লাহ তায়ালার পছন্দ হয়নি।

و ما يدريك لعله يزكى، أو يذكر فتنفعه الذكرى

‘তোমার কি জানা আছে? হয়ত সে শুধরে যেত। অথবা উপদেশ গ্রহণ করত এবং উপদেশ দান  তার উপকারে আসত’।

أما من استغنى، فأنت له تصدى

‘আর যে ব্যক্তি অগ্রাহ্য করছিল (আগ্রহ নিয়ে আপনার কাছে আসেনি, বরং দ্বীনের প্রতি অনাগ্রহ প্রকাশ করছে) আপনি তার প্রতি মনযোগ দিচ্ছেন আর চিন্তা করছেন,

و ما عليك ألا يزكى

‘অথচ সে নিজেকে না শোধরালে আপনার ওপর কোনো দায়িত্ব বর্তায় না। (যখন তার ভেতরে কোনো আগ্রহ নেই বরং অনাগ্রহ আছে, আপনাকে এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে না।) 

و أما من جاءك يسعى و هو يخشى فأنت عنه تلهى

পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি দৌড়ে তোমার কাছে আসল এবং সে অন্তরে আল্লাহর ভয় পোষণ করে, তার প্রতি তুমি অবজ্ঞা প্রদর্শন করছ!

আগ্রহীকে প্রাধান্য দেয়া চাই:

এতে নবী করিম (সা)-কে বন্ধুসুলভ ভর্ৎসনা করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য কখনোই এটা ছিল না-এ দুর্বল লোক আর ও শক্তিশালী। তাই একে উপেক্ষা করে ওর প্রতি মনোনিবেশ করবেন। বরং তার অন্তরে এ কল্যাণকামিতা ছিল, এ তো নিজের লোক, তার সঙ্গে পরেও কথা বলা যাবে, আর তারা দ্বিতীয়বার আসবে কি না জানা নেই।

তাই তাদের কাছে সত্যের বাণী পৌঁছে দেয়া উচিত। তবে আল্লাহ তায়ালা এটা পছন্দ করেননি। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি আগ্রহ নিয়ে এসেছে সে অগ্রাধিকার পাবে ওই ব্যক্তির উপর যে আগ্রহ নিয়ে বসেনি এবং উপেক্ষা প্রকাশ করেছে। তার প্রতি মনোনিবেশ করার প্রয়োজন নেই।  বরং যে আগ্রহ নিয়ে এসেছে তার প্রতি মনোনিবেশ করা চাই।

এ আয়াতগুলোতে যদিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্বোধন করা হয়েছে, তবে তার মাধ্যমে পুরো উম্মতকে এ শিক্ষা দেয়া হয়েছে, বাহ্যত সাধারণ কোনো ব্যক্তিকে বাস্তবেই সাধারণ মনে করো না। কারণ জানা নেই আল্লাহ তায়ালার কাছে সে মর্যাদায় কোনো স্তরে আছে। তাই তাকে সম্মান করা চাই।

বেহেশতি ও দোযখীদের আলোচনা: আল্লামা নববী (রহ.) এ প্রসঙ্গে প্রথম এ হাদিস বর্ণনা করেছেন-

عن حارثة وهب رضي الله عنه قال، سمعت رسول الله صلى الله عليه و سلم يقول : ألا أخبركم بأهل الجنة؟ كل ضعيف مستضعف لو أقسم على الله لأبره، ألا أخبركم بأهل النار؟ كل عتل جواظ مستكبر.

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে সম্বোধন করে বলেন, তোমাদেরকে বলবো জান্নাতে কারা? এরপর বলেন, প্রত্যেক যে ব্যক্তি দুর্বল এবং মানুষ যাকে দুর্বল মনে করে, হয়ত সে শারীরিক বা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হবে অথবা মর্যাদা হিসেবে দুর্বল হবে, অর্থাৎ দুনিয়াদারদের কাছে তার মর্যাদা কম। 

তবে সে আল্লাহ তায়ালার কাছে এত প্রিয় যে, যদি সে আল্লাহর নামে শপথ করে, আল্লাহ তার শপথ পূর্ণ করে দেন। যদি সে শপথ করে বলে, অমুক কাজ এভাবে হবে, আল্লাহ তায়ালা ওই কাজ ওইভাবে করে দেন। কারণ সে আল্লাহ তায়ালার প্রিয় ব্যক্তি। আল্লাহ তায়ালা তার ভালোবাসার কারণে এরূপই করে দেন।

আল্লাহওয়ালাদের মর্যাদা:

হাদিস শরিফে আছে, একদা দুই নারীর মাঝে ঝগড়া হয়ে গেছে। ঝগড়ায় এক নারী অন্য জনের দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছে। ইসলামি আইন অনুযায়ী দাঁতের বদলা দাঁত। যখন এ শাস্তি শোনানো হলো, যে নারীর দাঁত ভাঙ্গার ফয়সালা হলো তার পৃষ্ঠপোষক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি শপথ করে বলছি, তার দাঁত ভাঙ্গবে না। 

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্তের ওপর আপত্তি করা তার উদ্দেশ্য ছিল না। শত্রুতাও না। বরং আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা বলে দিয়েছে অবস্থা এমন সৃষ্টি হয়ে যাবে, আল্লাহ চাহে তো তার দাঁত ভাঙ্গবে না। যেহেতু তার অনুভূতি শত্রুতামূলক ছিল না এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্তের ওপর আপত্তি করা উদ্দেশ্য ছিল না, এ জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথাটি খারাপ মনে করেননি।

যেখানে ইসলামে এ আইন আছে-দাঁতের বদলা দাঁত, চোখের বদলা চোখ, সেখানে ইসলামে এটাও রয়েছে-আক্রান্ত ব্যক্তি বা তার ওয়ারিসগণ যদি ক্ষমা করে দেয় তাহলে কিসাস রহিত হয়ে যাবে। বদলা নেয়ার কোনো প্রয়োজন থাকবে না। আল্লাহ তায়ালার করুণা, যে মহিলার দাঁত ভেঙ্গেছিল সে বলল, আমি মাফ করে দিলাম। তার ক্ষমা করায় কিসাসের অবসান হলো। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কোনো কোনো লোক আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রিয় হয়ে থাকে। তাদের বাহ্যিক অবস্থা হলে,  এলামেলো চুল, দুর্বল, কারো দরজায় গেলে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। তবে আল্লাহ তায়ালার কাছে তার এতো সম্মান যে, যদি সে আল্লাহর নামে কোনো শপথ করে বসে, আল্লাহ তার শপথ পূর্ণ করে দেন। এই ব্যক্তিও এমন, সে শপথ করে বলেছিল তার দাঁত ভাঙ্গা হবে না। আল্লাহর তার শপথ পূর্ণ করে দিয়েছেন। ওয়ারিশরা ক্ষমা করে দিয়েছে।

এ হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদিকে ইঙ্গিত করলেন, এমন ব্যক্তি যে দেখতে দুর্বল, মানুষ তাকে দুর্বল মনে করে, তবে খোদাভীতি, আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে সম্পর্ক ও আল্লাহর এবাদতের বিচারে সে আল্লাহ তায়ালার এত প্রিয় যদি সে আল্লাহর নামে শপথ করে, আল্লাহ তায়ালা তা পূর্ণ করে দেন। এরূপ লোকই জান্নাতি।

কঠোর স্বভাব ক্ষতিকারক:

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি তোমাদেরকে বলবো জাহান্নামী কারা? তারপর বললেন,

كل عتل جواظ مستكبر

‘প্রত্যেক যে ব্যক্তি কঠোর স্বভাবের হয়’।

এর অর্থ কঠোর স্বভাবের, রুঢ় ব্যক্তি, যে নম্ররতার সঙ্গে কথা বলে না। কঠোরতা ও ক্রোধের সঙ্গে কথা বলে, অন্যকে তুচ্ছ মনে করে। جواظ অর্থ চড়া মেজাজ, যার ললাটে সর্বদা ভাঁজ পড়ে থাকে, সাধারণ প্রকৃতির মানুষের সঙ্গে কথা বলতে প্রস্তুত হয় না। দুর্বল ও নিম্ন শ্রেণির লোাকদের সঙ্গে কথা বলাতে অপমানবোধ করে। সর্বদা আত্মম্ভরী থাকে।

مستكبر অহংকারী, যে নিজেকে বড় মনে করে এবং অন্যকে ছোট মনে করে। এ সকল গুণাবলীর অধিকারীদের ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন জাহান্নামী। কারণ তারাই عتل, جواظ ও مستكبر এবং তারা নিজেকে বড় মনে করে।

দরিদ্র লোক:

একদা মক্কার কাফেররা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলল, আমরা তো আপনার কাছে আসতে ও আপনার কথা শুনতে প্রস্তুত আছি, তবে সমস্যা হলো আপনার কাছে সর্বদা সাধারণ প্রকৃতির দরিদ্র লোক বসে থাকে। তাদের সঙ্গে বসা আমাদের মর্যাদার পরিপন্থী। তাই আপনি তাদের ও আমাদের আলাদা আলাদা বসার ব্যবস্থা করুন। তখন আমরা আপনার কাছে এসে আপনার কথা শুনতে প্রস্তুত আছি। 

বাহ্যত এতে কোনো মন্দত্ব ছিল না। তাদের জন্য ভিন্ন সময় নির্দিষ্ট করা হতো, সে সময় তারা দ্বীনের কথাবার্তা শুনতো। হয়ত দ্বীনের কথা শুনলে তাদের সংশোধন হয়ে যাবে। আমরা হলে তো মেনে নিতাম। আল্লাহ তায়ালা তৎক্ষণাত আয়াত অবতীর্ণ করেছেন-

و لا تطرد الذين يدعون ربهم بالغداة و العشي يريدون وجه

‘তাদেরকে বিতারিত করো না যারা তাদের প্রতিপালককে ডাকে সকাল-সন্ধ্যা তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য’।

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করে দিলেন, সত্যের আগ্রহ নিয়ে আসতে চাইলে তাদের সঙ্গে বসতে হবে। আর যদি বসতে না চাও তাহলে আল্লাহ ও তার রাসূল তোমাদের থেকে অমুখাপেক্ষী। তোমাদের জন্য ভিন্ন মজলিসের আয়োজন করা হবে না।

দৈনিক বগুড়া
দৈনিক বগুড়া
ধর্ম বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর