শনিবার, ২০ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১

অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালান বাবাহারা খাদিজা

অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালান বাবাহারা খাদিজা

খাদিজা আক্তারের বয়স এখন ১৮ ছুঁইছুঁই। ১২ বছর আগে তার বাবা মারা গেছেন। পেটের দায়ে খাদিজাকে শ্রমিকের কাজ করতে হয়েছে অন্যের ফসলি জমিতে। মাকে নিয়ে খাদিজা থাকেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরে। কিন্তু ঘরটিও তাদের নয়। ফসলি জমিতে কাজ করলে মা ও মেয়ের আহার জোটে, না করলে উপোস থাকতে হয়। খাদিজা জেলা ও জেলার বাইরে ক্রিকেট খেলায় অল রাউন্ডার খেলোয়াড় হিসেবেও পরিচিত। 

সম্প্রতি খাদিজা আক্তার ও তার মায়ের সঙ্গে  কথা হয়। খাদিজা আক্তার থাকেন শরীয়তপুর সদর উপজেলার তুলাসার ইউনিয়নের রঙের বাজার সংলগ্ন রাজ্জাক খলিফার বাড়ির সামনের একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে। ঘরটি তার বোন সাহিদা আক্তারের। সদর উপজেলার উপরগাঁও এলাকার কীর্তিনাশা নদীর পাড়ের বাসিন্দা মৃত সিরাজ শেখ ও সালেহা বেগম দম্পতির ছোট মেয়ে খাদিজা আক্তার। 

আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা, খাদিজা আক্তার ও তার পরিবার সূত্রে জানা যায়, এক যুগ আগে চার মেয়ে ও এক ছেলেকে রেখে মারা যান রিকশা গ্যারেজের শ্রমিক সিরাজ শেখ। আধা শতাংশ জমির ওপর ছোট্ট একটি ঝুপড়ি ঘর ছাড়া ছেলেমেয়েদের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারেননি সিরাজ শেখ। ছয় বছর বয়স থেকে অন্য ভাইবোনদের সঙ্গে শুরু হয় খাদিজার জীবন সংগ্রাম। অন্যের ফসলি জমিতে নিড়ানিসহ বিভিন্ন কাজ করে সংসার ও পড়াশোনা ভালোই চলছিল খাদিজার। বড় ভাইবোনেরা বিয়ে করলেও মাঝে মধ্যে খাদিজা ও তার মাকে সহযোগিতা করতেন। 

কিন্তু কয়েক বছর ধরে খাদিজার বড় বোন মঞ্জিলা বেগমের স্বামী রাজমিস্ত্রির সহকারী সালাম বেপারী ভবন থেকে পড়ে গিয়ে এখন অসুস্থ। মেজো বোন সাহিদা বেগম আগুনে পুড়ে গিয়ে অসুস্থ। তার স্বামী রুবেল ব্যাপারী ক্যানসার আক্রান্ত রোগী। সেজো বোন পিংকি আক্তারের পাকস্থলী ছিদ্র হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। ভাই মিরাজ শেখ পেশায় একজন অটোরিকশা চালক। তিনি তার দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে আংগারিয়াতে ভাড়া থাকেন। খাদিজা আক্তারের মা সালেহা বেগম বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। সংসারের খরচ, মায়ের ওষুধ, নিজের পড়াশোনা সব কিছুর ব্যয়ভার খাদিজা আক্তারকে বহন করতে হয়। 

খাদিজা অন্যের ফসলি জমির নিড়ানিসহ বিভিন্ন কৃষি কাজ করে উপার্জন করেন। কঠোর পরিশ্রমের এসব কাজ করেও খাদিজা পড়াশোনা ছেড়ে দেননি কখনো। হাই স্কুলে পড়ার সময় থেকে শরীয়তপুর স্টেডিয়ামে ক্রিকেটের প্র্যাকটিস করেন। খাদিজা আক্তার নারী ক্রিকেট দল শরীয়তপুরের হয়ে ঢাকা, রংপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিজয় অর্জন করেছেন। পরিবারের অর্থাভাবে এখন আর খাদিজা আক্তার ক্রিকেট প্র্যাকটিস করেন না। শরীয়তপুরের আংগারিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও সরকারি গোলাম হায়দার খান মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে উচ্চ শিক্ষার জন্য ওই কলেজেই খাদিজা আক্তার ভর্তির আবেদন করেছেন। 

গত ৫ সেপ্টেম্বর অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে গেলে হাসপাতালের সিঁড়ির নিচ থেকে খাদিজা আক্তারের সাইকেলটি চুরি হয়ে যায়। খাদিজা আক্তার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে কাকুতি মিনতি করেছিলেন সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে চোর শনাক্ত করে সাইকেলটি উদ্ধারের জন্য। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার কথায় সায় দেয়নি। অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা, পরিবারের খরচ, কলেজের ভর্তি ফি, বইপত্র কেনার অর্থ, কলেজে যাওয়া নিয়ে চিন্তায় খাদিজা আক্তারের দিন কাটে এখন।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা আকলিমা বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, খাদিজা আক্তারের জীবন সংগ্রাম অন্যরকম। আশ্রয়ণ প্রকল্পে যারা থাকেন তারা সবাই গরিব। কিন্তু খাদিজাদের মত গরিব আর একজনও নেই। অন্যের ফসলি জমিতে কাজসহ অনেক কষ্ট করে মেয়েটা। এত কিছুর মধ্যেও সে পড়াশোনা করে। খাদিজা কাজ করলে তাদের চুলায় আগুন জ্বলে, কাজ না করলে চুলা বন্ধ থাকে।

ইলিয়াস খলিফা নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, খাদিজা মেয়েটা চঞ্চল। একটা ছেলে যে পরিশ্রমের কাজ করতে পারে, খাদিজাও তাই করে। ওর পরিশ্রম দেখে আমরা অবাক হই।

খাদিজা আক্তারের মা সালেহা বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার বয়স হয়ে গেছে। ছেলেমেয়েকে বিয়ে দিয়েছি কষ্ট করে। সেই ছেলেমেয়েরা এখন অসুস্থ বলে আমার ভরণপোষণ দিতে পারে না। খাদিজাই কষ্ট করে চাল ডাল কিনে আনলে রান্না করে দুইজনে খেতে পারি। আমার মেয়েটা অনেক কষ্ট করে। যদি কেউ আমাদের সাহায্য করত, তাহলে আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম।

খাদিজা আক্তার বলেন, ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর কাজ করা শুরু করেছি। আগে বোন ও ভাই সংসারে কিছু টাকা দিত। এখন তারাই বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত, আমাদের দেবে কীভাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ যে আমার বোনকে তিনি ঘর দিয়েছেন। বোনটা যদি তার ঘরে থাকতে না দিত, তাহলে ওই ঝুপড়ি ঘরে থাকতে হতো। বৃষ্টি এলে ওই ঘরে পানি পড়ে বইপত্র, সার্টিফিকেট ভিজে যেত। আমার পরিবারের সবাই অসুস্থ। অসুস্থ মা ও আমার খরচ আমাকেই বহন করতে হয়। যদি কেউ আমার মায়ের চিকিৎসা করিয়ে দিত, আমাকে পড়াশোনার জন্য বৃত্তি দিত। তাহলে আমি পড়াশোনা ঠিকভাবে করতে পারতাম, ক্রিকেটে আবার প্র্যাকটিস করতে পারতাম।

শরীয়তপুরের বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ স্টেডিয়ামের কোচ সেলিম শিকদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, খাদিজা আক্তার এক সময় ক্রিকেট প্র্যাকটিস করত। বেশ ভালোই খেলত মেয়েটা। কিন্তু পরিবারের অর্থাভাবে এখন আর মাঠে আসে না। খাদিজা ক্রিকেটে ভালো করত বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু সবই নিয়তি এখন।

শরীয়তপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জ্যোতি বিকাশ চন্দ্র ঢাকা পোস্টকে বলেন, খাদিজা আক্তারের সংগ্রামের কথা শুনেছি আমি। আগামী সপ্তাহের মধ্যে তাকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি সাইকেল কিনে দেওয়া হবে। এছাড়াও তার পড়াশোনা, মায়ের চিকিৎসাসহ তার পরিবারের পাশে থাকবে উপজেলা প্রশাসন।

দৈনিক বগুড়া

সর্বশেষ: