• শনিবার   ২১ মে ২০২২ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৭ ১৪২৯

  • || ১৯ শাওয়াল ১৪৪৩

কোটি পরিবার ॥ আবারও ভোগ্যপণ্যের সুফল পাবে

দৈনিক বগুড়া

প্রকাশিত: ১৩ মে ২০২২  

ভোজ্যতেলসহ চার খাদ্যপণ্য নিয়ে আবারও কোটি পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছে সরকার। আগামী মাস থেকে টিসিবির সাশ্রয়ী মূল্যের খাদ্য সহায়তার মাধ্যমে স্বল্প আয়ের মানুষের হাতে ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল ও পেঁয়াজের মতো পণ্য পৌঁছে দেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জরুরী বৈঠক করে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পণ্য মজুদকারী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে মজুদকৃত ভোজ্যতেল উদ্ধারে সারাদেশে অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সহায়তায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লাখ লাখ লিটার তেল উদ্ধার করছে স্থানীয় প্রশাসন। অথচ ঈদের আগে সাধারণ ভোক্তারা বাজারে ভোজ্যতেল না পেয়ে খালি হাতে ঘরে ফিরেছেন। এ অবস্থায় ভোজ্যতেলের অসাধু ও অভিযুক্ত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করা হচ্ছে-যাতে বাংলাদেশে কারসাজি ও গুদামজাত করার বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থির করে সাধারণ মানুষকে যারা কষ্ট দেয় তাদের আর কোন ছাড় দেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

জানা গেছে, ভোগ্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার জরুরী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব মোঃ তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সিনিয়র সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়লেও দেশে ভোগ্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা, স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে বিশেষ করে টিসিবির ফ্যামিলি কার্ড প্রাপ্ত এক কোটি পরিবারের হাতে ভোজ্যতেলসহ চার ভোগ্যপণ্য পৌঁছে দেয়া, ভোজ্যতেল মজুদ ও আমদানি পরিস্থিতি, মজুদকারী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখা, জব্দকৃত তেল আগের মূল্যে বিক্রি, পেঁয়াজের বর্তমান বাজার মূল্য, প্রতিযোগিতা কমিশনের কার্যক্রম বাড়ানো এবং ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করার ওপর দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠকে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন। বিশেষ করে সারাদেশে অভিযানের মুখে লাখ লাখ লিটার ভোজ্যতেল উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এ কারণে মজুদকারী ব্যবসায়ীদের দিকে নজর রাখারও পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বৈঠক প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ বলেন, আগামী জুন মাস থেকে সারাদেশে টিসিবি আবারও কোটি পরিবারের হাতে সাশ্রয়ী মূল্যে ভোগ্যপণ্য পৌঁছে দেবে। শুধু তাই নয়, কোরবানির আগেও পরে টিসিবির এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

এ কারণে এটি একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। টিসিবির এই কার্যক্রমের ফলে স্বল্প আয়ের মানুষ কমদামে ভোগ্যপণ্য পাবেন। এর ফলে বাজারেও এর একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি জানান, টিসিবির এই কার্যক্রমে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সম্পৃক্ত থাকবেন। এছাড়া বিপুল পরিমাণ পণ্যসামগ্রী মজুদের বিষয় রয়েছে। এসব বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছায় সারাদেশে টিসিবি এই কার্যক্রম দ্বিতীয় বারের মতো শুরু করতে যাচ্ছে। আশা করছি সরকারের এ উদ্যোগের ফলে ভোগ্যপণ্যের দাম কমে আসবে। ভোজ্যতেল উদ্ধার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখা হবে। এক্ষেত্রে দোষী ব্যবসায়ীদের কোন ছাড় দেয়া হবে না। ভোক্তাদের জিম্মি করে কেউ পার পাবে না।

বৈঠক সূত্র জানায়, যেহেতু ভোগ্যপণ্যের দাম এখন বেশি আর সে কারণে স্বল্প আয়ের মানুষের দিক চিন্তা করে সরকারী বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবির মাধ্যমে আগামী মাস থেকে কোটি পরিবারের হাতে ভর্তুকি মূল্যের খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেয়া হবে। জুন মাস থেকে শুরু হয়ে আগামী ঈদ-উল-আজহার আগে এবং পরেও টিসিবির এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এতে করে কি কি পণ্য আমদানি ও মজুদ করতে হবে সে বিষয়ে টিসিবির পক্ষ থেকে সংস্থাটির চেয়ারম্যান বৈঠকে তুলে ধরেন। সভায় জানানো হয়, টিসিবির এই কার্যক্রমের ফলে কোটি পরিবারের হাতে পণ্য যাওয়ার অর্থ হচ্ছে দেশের প্রায় ৫ কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া, ইন্দোনেশিয়ার পামওয়েল রফতানি কার্যক্রম বন্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে বিশ্ব বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ভাল বলে বৈঠকে জানানো হয়।

আগামীতে ভোগ্যপণ্যের বাজারে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যাতে ‘মনোপলি’ ব্যবসার সুযোগ যাতে না নিতে পারে সে বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ চাওয়া হয়। এ লক্ষ্যে সরকারী সংস্থা টিসিবির কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেয়া হয়েছে। টিসিবি এখন ভোজ্যতেলসহ অন্যান্য পণ্য অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সংগ্রহ করে থাকে। তবে এবার ভোজ্যতেল ও পেঁয়াজের মতো পণ্য টিসিবি সরাসরি আমদানি করতে যাচ্ছে। আগামীতে ভোজ্যতেল ও চিনির মতো পণ্যের বাজার সামাল দিতে টিসিবি সরাসরি এসব পণ্য পরিশোধিত কিংবা অপরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চাল ও গম যেমন সরকার ক্রয় করে প্রয়োজনের সময় তা বাজারে ছাড়ে ঠিক তেমনি ভোজ্যতেল ও চিনির মতো পণ্যের ভা-ার গড়ে তুলতে চায় টিসিবি। যদিও সরকারী চিনিকলগুলোতে পর্যাপ্ত চিনি রয়েছে। এ কারণে ব্যবসায়ীরা চিনি নিয়ে তেমন কারসাজির সুযোগ পায় না। তবে ভোজ্যতেল ও পেঁয়াজ নিয়ে ব্যবসায়ীরা সব সময় মনোপলি ব্যবসার সুযোগ নিয়ে বাজার অস্থির করে থাকে। উল্লেখ্য, দেশব্যাপী এক কোটি নিম্ন আয়ের পরিবারের হাতে গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবির পণ্য পৌঁছে দেয়া হয়। ওই সময় দুই কিস্তিতে এক কোটি পরিবারে টিসিবির পণ্য দেয়া হয়। এবার ঢাকা ও বরিশালে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে টিসিবির পণ্য পৌঁছে দেয়া হবে।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে সরকারী এই সহায়তায় দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কোটি পরিবারে হাসি ফুটেছে। আগামীতে সারাবছর যাতে এই কর্মসূচী চালিয়ে নেয়া যায় সেই দাবিও তুলেছেন সাধারণ ভোক্তারা।

ব্যাপক সাড়া পড়ায় আগামীতে টিসিবির এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। টিসিবির এই কার্যক্রমে নিত্যপণ্যের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বাজারের ওপর চাপ কমায় সাধারণ ভোক্তারাও মোটামুটি ন্যায্যমূল্যে ভোগ্যপণ্য কিনতে পেরেছেন। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে একটি পরিবার রোজার আগে ও মাঝামাঝি সময়ে দুইবার করে ২ কেজি চিনি, ২ কেজি ডাল ও ২ লিটার তেল কিনতে পেরেছেন। এতে প্রতি লিটার তেলের মূল্য হবে ১১০ টাকা, প্রতিকেজি চিনি ৫৫ টাকা ও প্রতি কেজি মসুরের ডালের দাম ধরা হয়েছে ৬৫ টাকা। এছাড়া রোজার মাঝে ২ কেজি ছোলা, পেঁয়াজ ও খেজুর যুক্ত করে বিক্রি করা হয়েছে। এতে কমদামে ইফতার পণ্যসামগ্রী কিনতে পেরেছেন উপকারভোগীরা। টিসিবির পণ্য পেয়ে খুশি হয়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। এছাড়া আগামীতে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে টিসিবির খাদ্য সহায়তা পাবে ঢাকা মহানগীর ১২ লাখ পরিবার। এতে উপকৃত হবেন প্রায় ৬০ লাখ স্বল্প আয়ের মানুষ। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকার জন্য ১২ লাখ ফ্যামিলি কার্ড বরাদ্দ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এখন উপকারভোগীদের তালিকা চূড়ান্ত করার জন্য দুই সিটি কর্পোরেশনকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

দৈনিক বগুড়া
দৈনিক বগুড়া