রোববার, ২৬ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

‘ডিজিটাল ডিটক্স’ কী? কীভাবে করবেন?

‘ডিজিটাল ডিটক্স’ কী? কীভাবে করবেন?

সংগৃহীত

একটা সময় ছিল, ফেসবুক চালানো ছিল একটা ফ্যাশন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা এই ফ্যাশনে এতটাই আসক্ত হয়ে গেছি যে এখন আবার উঠেছে উল্টো রব, যাকে ইংরেজিতে বলে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’। কাজেই এখনকার ফ্যাশন হলো, ফেসবুক ছেড়ে দেওয়া। ফেসবুকে না থাকাটাই এখন ‘স্মার্টনেস’।

পাঁচ বছর ধরে বিশ্বব্যাপী চলছে ডিজিটাল ডিটক্সের জোয়ার। মন খারাপ? সমাধান কী? ফেসবুক ডিলিট করো। একা একা লাগে, সমাধান কী? ফেসবুক থেকে বিরতি নাও। মনোযোগ আসে না, পড়ায় মন বসে না, উপায় কী? ফেসবুক আর ইউটিউব ছাড়তে হবে, তবেই মন বসবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্যাপারটা কি এতটাই সহজ? গবেষণা আমাদের কী বলে?

গবেষণা আমাদের বলে, ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের নানাভাবে ক্ষতি করে। কথাটা সত্য। লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের প্রতিযোগিতা যেমন আমাদের ডুবিয়ে রাখছে ডোপামিনে, তেমনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিনা কারণে স্ক্রল করে যাওয়ার অভ্যাসটাও আমাদের মস্তিষ্ককে প্রতিনিয়ত চাপে ফেলে দেয়। অসুস্থ সামাজিক প্রতিযেগিতায় লিপ্ত হই আমরা। কিন্তু সবকিছুর জন্যই কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দায়ী? এ ভাবনাও আবার ভুল।

অনলাইনের চেয়ে অফলাইনের বন্ধুত্ব, আড্ডা অবশ্যই ভালো। কিন্তু এই ব্যস্ততার যুগে আমাদের অনেকের জন্যই সামনাসামনি বসে আড্ডা দেওয়াও কঠিন। এই অভাব পূরণ করে দেয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। অনেক মানুষই এখান থেকে কথা বলার বা আড্ডা দেওয়ার মতো বন্ধু খুঁজে পান। খুঁজে পান জীবনসঙ্গী। চাকরির খোঁজখবর পান। পান নানা সমস্যার সমাধান।

 
 
 
 
 
 
 

এখন সময়টাই এমন যে মানুষ ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছেড়ে দিলে বন্ধুদেরও হারিয়ে ফেলার ভয় থাকে। থাকে সময়ের স্রোত থেকে ছিটকে পড়ার ভয়। এককথায়, ‘একঘরে’ হওয়ার জন্য আপনার আর আলাদা করে একঘরে হওয়ার দরকার নেই। সব রকম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেললেই যথেষ্ট।
টেম্পল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক জর্দান শ্যাপ্রিও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসলে নতুন কোনো সমস্যা তৈরি করছে না। বরং আমাদের সমাজে আগে থেকেই যেসব সমস্যা আছে, সেগুলোই ভিন্নভাবে উঠে আসছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

কাজেই, সমস্যার সমাধান না করে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। বলা হয় যে ফেসবুক বা টুইটার আমাদের প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। কেউ ‘সুখে থাকলে’ আপনার ইচ্ছা করে ‘আপনি যে আরও বেশি সুখে আছেন’ সেটা দেখানোর। কিন্তু এই চাপ কি শুধু ফেসবুকেই থাকে? না। বরং বাস্তব জীবনেও ‘বন্ধু’, ‘কলিগ’, ‘পাশের বাসার ভাবি’, অমুক–অমুকের সঙ্গে আপনি প্রতিনিয়ত মনে মনে প্রতিযোগিতা করেন। আপনার বন্ধু ভালো করলে, আপনার মা–বাবা সে কথা বারবার আপনাকে বলে চাপ দিতে থাকেন! এগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসার আগেও ছিল। যদিও এখন তা সহজেই অনেকের ভেতর এই প্রবণতা তৈরি করছে।

ইনস্টাগ্রামে ফিল্টার করা মেকি ছবি দেখে যে তরুণী নিজের চেহারা বা শরীর নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগেন, ইনস্টাগ্রাম বন্ধ করে দিলেই কি তাঁর এই হীনম্মন্যতা চলে যাবে? না, যাবে না। বরং যত দিন সমাজে সৌন্দর্যের ভুল সংজ্ঞা থাকবে, এই চাপও তাঁর ওপর তত দিনই থাকবে। এটা আসলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ নয়, এটা বৈষম্যমূলক সমাজের চাপ। কাজেই, সামাজিক সমস্যার সমাধানের জন্য সমাজকে ঠিক করতে হবে। সামাজিক সমস্যার যে অসুখ, শুধু ফেসবুক বন্ধ করলে সে অসুখ থেকে আমরা পাকাপাকিভাবে মুক্তি পাব না।

তবে মোটের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর যতটা কম নির্ভরশীল হওয়া যায়, ততই মঙ্গলজনক। বাস্তব জীবনে আপনি খুব একা হন, তাহলে সামাজিকতা ও বন্ধুত্ব রক্ষার জন্য যতটুকু ফেসবুক ব্যবহার করা প্রয়োজন, ততটুকু ব্যবহার আপনি করতে পারেন। সবাই বাদ দিয়েছে বলে আপনাকেও একেবারে বাদ দিতে হবে, এমন ভাবার প্রয়োজন নেই।

তবে লাইক, শেয়ারের নীরব প্রতিযোগিতা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করার মতো অভ্যাসগুলো থেকে বের হয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কখনোই বাস্তব জীবনের বিকল্প ভাবা যাবে না, বরং এটাকে জীবনের ছোট একটা অংশ হিসেবে রেখে দিতে পারেন। পাশাপাশি অফলাইন জীবনে আরও সক্রিয় হয়ে উঠুন। নতুন নতুন বন্ধু বানান, সামাজিক কাজকর্মে নিজেকে জড়িয়ে নিন। সময় বেঁধে দিন। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, ইউটিউব মিলিয়ে প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় না কাটানোই ভালো। ব্যক্তিগত জীবন যতটা সম্ভব আড়ালে রাখুন। নিরাপদে রাখুন। নেতিবাচকতা ও তর্ক এড়িয়ে চলুন। গণ্ডি ছোট রাখুন। অপরিচিত মানুষকে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত করার কী দরকার! প্রতিক্রিয়াশীলদের থেকে দূরে থাকুন। শেষে কথা একটাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জিনিসটা হলো ছুরির মতো। ফলও কাটা যায়, আবার খুনও করা যায়। আপনি কী করবেন, সে সিদ্ধান্ত আপনার। আপনি ফেসবুক চালালে সমস্যা নেই। কিন্তু ফেসবুক যেন আপনাকে না চালায়!

সূত্র: প্রথম আলো

সর্বশেষ: