• শনিবার   ১৬ অক্টোবর ২০২১ ||

  • আশ্বিন ৩০ ১৪২৮

  • || ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্প বাস্তবায়নে বগুড়ায় আনন্দের বন্যা

দৈনিক বগুড়া

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১  

অনুমোদনের প্রায় তিন বছর পর পরামর্শক নিয়োগের মাধ্যমে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে সব বাধা দূর হওয়ায় বগুড়ার সর্বস্তরের মানুষ আনন্দিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুত বড় ধরনের ওই প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু হবে-এমনটাই প্রত্যাশা তাদের। বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’র নেতৃবৃন্দ বলছেন, বহু প্রতিক্ষিত বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার সঙ্গে বগুড়াসহ উত্তরের ১১টি জেলার যোগাযোগ সহজ হবে যার মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নতি হবে।

যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মিত হওয়ার পর থেকেই বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলাচলের দাবি উঠতে থাকে। কারণ ওই দুই জেলার মধ্যে সরাসরি রেলপথ না থাকায় বগুড়া ও বৃহত্তর রংপুরের জেলাগুলো থেকে ঢাকাগামী ট্রেনগুলোকে সান্তাহার, নাটোর এবং পাবনার ঈশ্বরদী হয়ে প্রায় ১১২ কিলোমিটার ঘুর পথে চলাচল করতে হয়। বাড়তি ওই পথ ঘুরতে একদিকে যেমন সময়ের অপচয় হয় তেমনি বেশি ভাড়াও গুনতে হয়। বগুড়া থেকে যেখানে সড়ক পথে ঢাকা পৌঁছাতে লাগে ৭ ঘন্টা সেখানে ট্রেনে ঘুরপথে যেতে লাগে ১০ থেকে ১১ ঘন্টা। এজন্য বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণের দাবিতে এক সময় আন্দোলনও গড়ে ওঠে।  

এরপর ২০০৫ সালের মাঝামাঝি বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে প্রথম একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে রেলপথ নির্মাণের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে জমি অধিগ্রহণের জন্য সে সময় প্রাথমিক জরিপও চালানো হয়। কিন্তু পরিবহন মালিক সমিতির তৎকালীন শীর্ষ নেতা বিএনপি দলীয় এক সাংসদের বাধার কারণে প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি। 

তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রংপুর ও লালমনিরহাটসহ উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকামুখী একাধিক আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হলে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ সরাসরি রেলপথ নির্মাণের দাবি আবারও জোরালো হতে থাকে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালের ৯ এপ্রিল সিরাজগঞ্জে এক জনসভায় ভাষণদানকালে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ স্থাপনে প্রথম প্রতিশ্রুতি দেন। তার ৪ বছর পর ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর বগুড়ায় দলীয় এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর পুরানো প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে ২০১৮ সালের ৩০অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি-একনেক-এর সভায় প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৩ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা ঋণ দিতেও সম্মত হয় ভারত। কিন্তু পরামর্শক নিয়োগ না হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের সমীক্ষা ও চুড়ান্ত নকশা প্রণয়নের কাজ আটকে যায়। তবে প্রায় ৩ বছর অপেক্ষার পর গত ২৭ সেপ্টেম্বর এক চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় দুই প্রতিষ্ঠানকে ওই প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন জানান, নকশা চুড়ান্ত হওয়ার পরই দরপত্র আহবান করা হবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৩ সালের প্রথম দিকে প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু হবে।

বগুড়ায় রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের আওতায় বগুড়া শহরের পুরান বগুড়া তিনমাথা রেলগেটের পশ্চিমে দু’টি রেল লাইন জেলার শাহাজানপুর উপজেলার রাণীরহাট ও শেরপুর উপজেলা সদর হয়ে সিরাজগঞ্জের দিকে যাবে। ডুয়েল গেজের ওই দু’টি রেল লাইনের একটি বগুড়া রেল স্টেশন থেকে এবং অপরটি কাহালুর দিক থেকে আসবে। দুই জেলা সীমানার মধ্য দিয়ে নির্মিত ৮৬ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথে ৫টি নতুন স্টেশন নির্মাণ করা হবে।

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগের খবর মঙ্গলবার দেশের একাধিক দৈনিকে প্রকাশিত হওয়ার পর বগুড়াবাসী বেশ উচ্ছ্বসিত। প্রকল্পের আওতায় যেখান থেকে নতুন রেলপথ নির্মাণ হওয়ার কথা বগুড়া শহরের পুরান বগুড়ার তিনমাথা রেলগেটের পশ্চিমে খাদ্য গুদাম এলাকায় কথা হয় দোকানি বাবু মিয়ার সঙ্গে। পুণ্ড্রকথাকে তিনি বলেন, ‘ পেপারে পড়ছি বগুড়া- সিরাজগঞ্জ রেল লাইনের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। এজন্য খুব আনন্দ লাগছে। কারণ রেলপথটি নির্মিত হলে এই এলাকার চেহারাই পাল্টে যাবে, পুরান বগুড়া নতুন বগুড়া হবে।’ তিনি তার দোকানের পাশে একটি ভবন দেখিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এই পথ দিয়ে একটি রেল লাইন যাবে আর ৫০০ মিটার দূর দিয়ে আরেকটি রেল লাইন যাবে। দুই লাইন রাণীরহাট এলাকায় একটি জংশনে মিলিত হবে।’

রাণীরহাট এলাকার পার্শ্ববর্তী আশেকপুর মধ্যপাড়ার বাসিন্দা মুকুল মণ্ডল জানান, নাটোর-বগুড়া মহাড়ক অতিক্রম করার পর তাদের গ্রামে একটি জংশন হওয়ার কথা। এজন্য প্রকল্পটি অনুমোদনের আগে রেল বিভাগের একাধিক লোকজন তাদের এলাকায় ওই জংশনের জন্য সীমানা নির্ধারণী পিলারও পুঁতে দিয়ে গেছে।’ মোহাম্মদ কাসেম নামে অপর এক যুবক জানান, ‘জংশন করা হলে এই এলাকায় নতুন একটি শহর গড়ে উঠবে। যেখানে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।’

রাণীরহাট এলাকার বাসিন্দা ফেরদৌস আলম প্রকল্পটির কাজ দ্রুত শুরু করার তাগাদা দিয়ে বলেন, ‘এরই দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে আমরা অপেক্ষার প্রহর গুণছি। আজ প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে আমরা আশা করবো তাঁর প্রতিশ্রুত প্রকল্পের কাজ খুব দ্রুত শুরু করা হবে।’

বগুড়া চেম্বার অব  কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান মিলন মনে করেন বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত সরাসরি রেলপথ নির্মিত হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে শুধু বগুড়ারই উন্নয়ন হবে না। পাশাপাশি রংপুর বিভাগের ৮ জেলা এবং রাজশাহী বিভাগের জয়পুরহাট এবং নওগাঁরও ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নতি হবে।

তিনি বলেন, ‘বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্প এ অঞ্চলের চেহারাই পাল্টে দিবে।’

বগুড়ায় রেলওয়ের সহকারি নির্বাহী প্রকৌশলী সাইদুর রহমান জানান, প্রকল্পের সব কাজই সদর দপ্তর থেকে করা হচ্ছে। আমরা যতদূর জেনেছি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রথমে পুরো প্রকল্প এলাকায় সমীক্ষা চালাবেন এবং পরে তারা নকশা চূড়ান্ত করবেন।

দৈনিক বগুড়া
দৈনিক বগুড়া