শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

কাহালুর বিভিন্ন স্থানে জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা

কাহালুর বিভিন্ন স্থানে জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা

বাঙালি অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক। বাঙালি বরাবরই উৎসব মুখর জাতি। আর তাই বাঙালির যে কোনো উৎসবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনতার ঢল নামে। বিভিন্ন ধর্ম-গোত্র ও সম্প্রদায় সবার অংশ গ্রহনে বিভিন্ন তিথি-পার্বন, ঐতিহ্যবাহী মেলা ও সব ধরনের উৎসব প্রাণবন্ত হয়ে উঠে।

মেলা বাঙালির লোক-ঐতিহ্যের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ হলেও নিদ্রিষ্ট কিছু মেলা বাঙালির ধারক ও বাহক হয়ে  উঠেছে। বাঙালির লোকসংস্কৃতির অন্যতম মেলার মধ্যে রয়েছে বগুড়ার কাহালু উপজেলার বিভিন্ন স্থানের জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা। এই মেলার মাধ্যমে মনুষ্যত্ব, মানবিকতা, উদার মানুষিকতা ও সম্প্রীতির বন্ধনে মিলিত হন সকলে। সম্প্রীতির কেন্দ্রবিন্দু এই মেলাতে আবহমান বাংলার, বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস-ঐতিহ্য ফুটে উঠে।

এই জনপদে কখন, কোথায়-কবে প্রথম মেলা হয়েছিল তা জানা না গেলেও এই মেলাগুলো বাঙালির প্রাচীন ঐতিহ্য এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও মধুমাস জ্যৈষ্ঠের প্রথম সপ্তাহ থেকে একদিনের এই জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ভেঁপড়া, কাহালু, উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ সাবানপুর, পাবহারাসহ বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখানে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও পুরো জ্যৈষ্ঠ মাস জুড়েই প্রায় অর্ধশত জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলার আয়োজন করা হবে বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন।

বোরো ধান কাটা-মড়াইয়ের সাথে সাথে উপজেলার প্রতিটি গ্রামে ঘর-বাড়ি পরিস্কার করা হয় আত্নীয়স্বজনসহ মেহমানদের জন্য। গরীব-ধনী বলে কথা নয়, সবাই জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা উপলক্ষ্যে উদার মনে পরিচিত মানুষদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেন। নিমন্ত্রণের ক্ষেত্রে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র ও সম্প্রদায়ের বাদ-বিচার করা হয়না। সামর্থ অনুযায়ি জামাই-মেয়ে নিকট আত্নীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের জ্যৈষ্ঠ-জামাই মেলা উপলক্ষ্যে সমাদর করা হয়। যেখানে মেলার আয়োজন করা হয়, সেই এলাকার আশে-পাশের গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে মেহমানদের সমাদরে ধুম পড়ে যায়। মেলা ও প্রতিটি বাড়ি সকল বর্ণের মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়।

প্রবীনজনদের ধারনা ও অনুসন্ধান  করে ধারনা পাওয়া যায় এই জনপদে মেলাগুলোর আগে নাম ছিলো মাদার পীরের মেলা। হারুত-মারুতের কথিত কথায় না গিয়ে মাদার পীরের অনুসারীদের মতে যাকে মাদার বলা হয়, তিনি একজন মারফতি পীর। এক সময় মারফতি মাদার পীরের অনেক অনুসারী ছিলেন এই জনপদে। এই অনুসারীরা ছিলেন চুল জটাধারী নারী-পুরুষ। তারা একটি নিদ্রিষ্ট স্থানে ধ্যান-সাধনায় মগ্ন থাকতেন।

এই চুল জটাধারীদের অধ্যাত্বিক জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে জানতেন সাধারণ মানুষ। মানুষের বিপদ-আপদ ও অসুখ-বিসুখে  বিশ্বাসের উপর ভর করে এই জটাধারীদের সরণাপন্ন হতেন। এই জটাধারীদের যারা অনুসারী ছিলেন তাদের মাধ্যমে এই অঞ্চলে মাদার পীরের মেলা শুরু হয়। পরবর্তীতে  এই মাদার পীরের মেলা নিশানের মেলায় পরিনত হয়।

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে যখন বৃষ্টিপাত হতোনা, তখন গ্রামের মানুষ বৃষ্টির জন্য আরাধনা করতেন। নিশানের মেলার জন্য আয়োজকরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষের বাড়ি থেকে ধান-চাল সাহায্য নিতেন। এঁরপর তারা বাঁশের আগায় লাল শালু লাগিয়ে নিশান টাঙ্গিয়ে মেলা বসাতেন। সেই মেলার মাধ্যমে খড়ার সময় বৃষ্টিপাতের জন্য আরাধনা করা হতো। উপজেলার পাবহারা, সাবানপুর, ঢাকন্তা, কুশলিহারসহ অনেক জায়গায় নিশানের মেলার প্রচলন ছিলো।

পরবর্তীতে নিশানের মেলার মতই বিভিন্ন স্থানে জ্যৈষ্ঠ মেলার প্রচলন শুরু হয়। মেলা উপলক্ষ্যে জামাই-মেয়ে, নিকট আত্নীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধবদের নিমন্ত্রণ করা হতো। মেলা উপলক্ষ্যে প্রতিটি বাড়িতে জামাই-মেয়েকে আনার বিষয়টি ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারফলে প্রায় দুই যুগ আগে থেকে এই মেলাগুলো জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা নামে পরিচিতি লাভ করে।

প্রবীনরা এখনো নিশানের মেলা হিসেবে জানলেও বর্তমানে মানুষের মুখে মুখে এই মেলার জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা হিসেবেই বেশী পরিচিত। বাঙালির লোকসংস্কৃতির অন্যতম এই মেলার মাধ্যমে মিলন ঘটে নানা বর্ণের মানুষের। 

দৈনিক বগুড়া

সর্বশেষ: