শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৭ আষাঢ় ১৪৩১

শেরপুরে ঐতিহ্যবাহী কেল্লাপোশী মেলায় মাছ-মিষ্টিতে জামাই বরণ

শেরপুরে ঐতিহ্যবাহী কেল্লাপোশী মেলায় মাছ-মিষ্টিতে জামাই বরণ

বগুড়ার শেরপুরে ৫৬৭বছরের ঐতিহ্যবাহী কেল্লাপোশী নামধারী ‘জামাইবরণ’ মেলা শেষ হয়েছে। রবিবার থেকে শুরু হয়ে বুধবার সন্ধ্যায় মেলাটি শেষ হয়। মেলায় বিভিন্ন ধরনের কাঠের আসবাবপত্র, বিশাল আকারের মাছ, রকমারি মিষ্টি, ঘুড়ি, তৈজসপত্রসহ হরেক রকম পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। তবে প্রতিবছরের মতো এবারের মেলায় প্রধান আকর্ষণ মাছ ও মিষ্টি।

মেলায় দশ থেকে বিশ কেজি ওজনের   কাতল, রুই, বোয়াল, পাঙ্গাস, সিলভার কার্প, চিতলসহ নানা ধরনের মাছ উঠে। উঠেছে নানা পদের মিষ্টি। এর কিছু কিছু পদের একেকটি মিষ্টির ওজন পাঁচ থেকে দশ কেজি। মেলা উপলক্ষে শ্বশুর-শাশুড়িরা জামাইদের বাড়িতে দাওয়াত করে বাড়িতে এনে মোটা অঙ্কের টাকা সালামি দেন। জামাই বাবুরাও সেলামির টাকার পাশাপাশি নিজেদের টাকা যোগ দিয়ে মেলা থেকে ধুমসে কেনাকাটা করেন। সেইসঙ্গে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য অনুযায়ী নিমন্ত্রণে আসা মেয়ে-জামাইদের সঙ্গে নিয়ে এসে ছাতা, মিষ্টি ও লুঙ্গিসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য কিনে দেওয়া হয়। বুধবার (৩১মে) দুপুরে উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে কেল্লাপোশী নামক স্থানে অনুষ্ঠিত মেলার শেষদিনে আসা জামাই, শ্যালক-শ্যালিকা এবং মাছ ও মিষ্টি   দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে এইসব তথ্য জানা যায়।

মেলা উপলক্ষে নানা বাড়িতে বেড়াতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী  সুমাইয়া আক্তার ও হাসানুল মারুফ শিমুল জানান, পরিবারের সবার সঙ্গে মিলে মিশে আনন্দ উৎসবে শামিল হতে প্রতিবছরই তারা এই মেলায় আসেন। এছাড়া বড় বড় মাছ ও রকমারি মিষ্টি খাওয়ার লোভ তো রয়েছেই।

উপজেলার সাধুবাড়ী গ্রাম থেকে মেলা উপলক্ষে উচরং গ্রামস্থ শ্বশুরালয়ে আসা সোহানুর রহমান সান জানান, তিনি পনের হাজার টাকা দিয়ে ১৪  কেজি ওজনের একটি কাতল মাছ কিনেছেন। এরপর বারো কেজি মিষ্টি কিনে শ্বশুরালয়ে ফিরছেন। পরে আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত করে এনে সবাই মিলে এসব খাবেন বলে তিনি জানান।

এদিকে মাছ ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবির ও দুলাল হোসেন জানান, বরাবরের মতো এই বছরও তারা এই মেলায় অনেক মাছ নিয়ে এসেছেন। বেচা বিক্রিও বেশ ভালো। একটু বাড়তি কষ্ট হলেও ব্যবসায় লাভ হওয়ায় সেই কষ্টকে কষ্ট মনে হচ্ছে না।

মাছের আড়ৎদার জিয়াউর রহমান জানান, এই বছরও মেলায় যমুনা নদী  থেকে ধরা বিভিন্ন প্রজাতির বড় বড় মাছ আনা হয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে চলনবিল ও জলাশয়ে চাষ করা প্রচুর মাছ। এর মধ্যে রয়েছে বোয়াল, পাঙ্গাস, রুই, মৃগেল, কাতল, সিলভার কার্প, বিগহেডসজ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।

মাছ ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান জানান, তাদের দোকানের যমুনা নদীর বড় বোয়াল মাছটির ওজন প্রায় দশ কজি। ক্রেতারা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত বলেছেন। আর কাতল মাছটির ওজন পনের কেজি। দাম হাঁকা হয়েছে আঠারো হাজার টাকা। ক্রেতারা বারো হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বলেছেন। এসব মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, পাঁচ থেকে ১০ কেজি ওজনের মাছের চাহিদা বেশি। তাই এই বছর  মেলায় ব্যাপারি এই ওজনের মাছের বেশি এনেছেন। এই ওজনের প্রতি কেজি কাতল মাছ ৫০০-৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক থেকে আসা মিষ্টি দোকানি আবু আলম ও গোলাম রব্বানী জানান, তারা ছোট বেলা থেকে এই মেলায় মিষ্টি বিক্রি করেন। তাদের দোকানে পাঁচ থেকে দশ কেজি ওজনের মিষ্টিসহ নানা ধরনের বাহারি মিষ্টি রয়েছে। এইসব মিষ্টি ৬০০-১৫০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।

অপরদিকে মেলার অন্যতম আকর্ষণ কাঠের রকমারি পণ্য। এইসব পণ্যের  বেচাকেনা জমবে মেলা ভেঙে যাওয়ার পরের দুই-তিনদিন। কেননা দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা বিক্রি না হওয়া পণ্য ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঝক্কি-ঝামেলা এইড়াতে কম দামে তা বিক্রি করে দেন। আর এই সুযোগটা কাজে লাগান ক্রেতারা। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তাই গতকাল থেকে মেলা শেষ হলেও রকমারি কাঠের পণ্য ট্রাকে ভরে মেলায় আসতে দেখা যায়। গ্রাম বাংলার মেলবন্ধন ঐতিহ্যবাহী এই মেলা উৎসবে যেন বিঘ্ন না ঘটে সেজন্য নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেন স্থানীয় সরকার দলীয় এমপি বীরমুক্তিযোদ্ধা আলহাজ¦ হাবিবর রহমান। তিনি বলেন, বাঙালির এসব উৎসব ধরে রাখতে হবে প্রাণের তাগিদে। মেলা আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মতি বলেন, সবার সহযোগিতায় এবারের ঐতিহ্যবাহী কেল্লাপোশী মেলা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ সম্পন্ন হওয়ায় প্রশাসনসহ সকলের প্রতি কৃতজ্ঞাপন করেন।

প্রসঙ্গত: প্রতিটি মেলার পিছনেই কিছু না কিছু লোকগাঁথা কথা থাকে। কেল্লাপোষী মেলা সম্পর্কে তেমনি একটি লোক গাঁথার কথা জানা যায়। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এই মেলা হয়ে আসছে বলে কথিত আছে। এ সম্পর্কে জানা যায়, বৈরাগ নগরের বাদশা সেকেন্দারের একজন ঔরশজাত পুত্র এবং একজন দত্তক পুত্র ছিলেন। ঔরশজাত পুত্রের নাম গাজী মিয়া ও দত্তক পুত্রের নাম কালু মিয়া। গাজী মিয়া দেখতে খুবই সুদর্শন ছিলেন। তারা রাজ্যের মায়া ত্যাগ করে ফকির সন্যাসীর বেশ ধারন করে ঘুরতে ঘুরতে ব্রাহ্মন নগরে আসেন। সেখানে ব্রাহ্মন রাজমুকুটের একমাত্র কন্যা চম্পা গাজীকে দেখে মুগ্ধ হন। এক পর্যায়ে তারা দু’জন দু’জনকে ভালবেসে ফেলেন। পালিত ভাই কালু মিয়া বিষয়টি জানতে পেরে গাজীর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে মুকুট রাজার নিকট যান। মুকুট রাজা ফকির বেশী যুবকের এরূপ স্পর্ধা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে বন্দি করেন। এতে গাজী মিয়া দারুন আঘাত পান। তিনি মুকুট রাজার নিকট থেকে ভাই কালু মিয়াকে উদ্ধারের জন্য কেল্লাপোষী নামক স্থানে একটি দূর্গ নির্মাণ করেন। পরে রাজার সাথে যুদ্ধ করে ভাইকে উদ্ধার এবং তার কন্যাকে বিয়ে করেন। আর ওই দিনটি ছিল জ্যেষ্ঠ মাসের দ্বিতীয় রোববার। ওই সময় গাজীর বিয়ে উপলক্ষে কেল্লাপোষী দূর্গে নিশান উড়িয়ে তিন দিনব্যাপি আনন্দ উৎসব চলে এবং সেখানে মাজার গড়ে তোলা হয়েছে। মেলা চলাকালে সেখানে ভক্তরা আসর বসায়। ওই দিনগুলোকে অম্লান করে রাখতে প্রতি বছর জ্যেষ্ঠের দ্বিতীয় রোববার থেকে তিন দিনব্যাপি মেলা বসে। আর এই মেলা উপলক্ষে এলাকাবাসি নতুন জামাইকে ঘরে এনে আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠেন। এছাড়া নিকট আত্মীয়স্বজনের পদচারনায় মুখরিত হয়ে ওঠে মেলা এলাকা। এদিকে মেলা শুরু প্রায় সপ্তাহখানেক আগ থেকে গ্রামে গ্রামে চলে মাদার খেলা (লাঠি খেলা)। একটি বড় বাঁশকে লাল কাপড়ে মুড়িয়ে ও নানা রংয়ে সাজিয়ে এবং সেটির বিভিন্ন স্থানে চুল লাগিয়ে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল বেরিয়ে পড়ে। ঢাক-ঢোল, গান-বাজনার নানান সরঞ্জামাদি আর লাঠি নিয়ে তারা গ্রাম-গঞ্জ থেকে শুরু করে শহরে খেলা দেখায়। মেলা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত চলে ওই মাদার খেলা। জ্যেষ্ঠের দ্বিতীয় রোববার দলটি মেলা এলাকায় অবস্থিত মাজার প্রাঙ্গনে গিয়ে তা শেষ করে। এবছরও মেলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্নস্থানে মাদার খেলা চলে। 

দৈনিক বগুড়া

সর্বশেষ: