• বুধবার   ০৮ ডিসেম্বর ২০২১ ||

  • অগ্রাহায়ণ ২৪ ১৪২৮

  • || ০৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

স্বদেশে ফেরার আশায় রোহিঙ্গারা!

দৈনিক বগুড়া

প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট ২০১৯  

 
মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর সেদেশের সেনা ও তাদের সহযোগীদের চরম নৃশংসতার দুই বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আরসা নামে একটি সংগঠন নিরাপত্তারক্ষীদের ওপর হামলা চালায়। এতে কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন।

ওই ঘটনার জের ধরে হাজার হাজার রোহিঙ্গার ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়ে লুটপাট করে মিয়ানমারের সেনারা। প্রাণ বাঁচাতে দলে দলে উখিয়া-টেকনাফে ঢুকে পড়েন রোহিঙ্গারা। বসতির জন্য বিভিন্ন পাহাড়ের গাছ-পালা কেটে সাড়ে ছয় হাজার একর বনভূমি ধংস করে শত শত ঝুপড়ি ঘর তৈরি করা হয়।

পালিয়ে আসার পথে নদী-সাগরে নৌকা ডুবির ঘটনায় মারা যান কয়েকশ’ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু। এরমধ্যে উখিয়া-টেকনাফে বিভিন্ন এলাকায় ১৯৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রায় সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে।

সরেজমিনে রোববার সকালে টেকনাফের শালবাগান শরণার্থী শিবিরে গিয়ে দেখা যায়, দোকানপাটে রোহিঙ্গারা বসে আড্ডা দিচ্ছেন আর ২৫ আগস্ট নিয়ে কথা বলছেন। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন মিয়ানমার সরকারে বিরুদ্ধে।

দুই বছর আগে ২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট রাখাইনে বড় গজিরবিল এলাকায় হঠাৎ করে শুরু হয় মিয়ানমার সেনা সদস্যদের তান্ডব। আকাশ থেকে হেলিকপ্টার ও গ্রামের চারপাশ ঘিরে সেনারা একের পর এক হামলা চালায়। জ্বালিয়ে দেয়া হয় রোহিঙ্গাদের বসত ঘর। রাস্তা-ঘাট দখলে নেয় সেনা সদস্যরা। প্রাণের ভয়ে রোহিঙ্গারা সেদেশের পাহাড় জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। হামলার মাত্রা এতো বেশি ছিল যে, মিয়ানমার ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় রোহিঙ্গারা। এ দিনটি ছিল ‘রোহিঙ্গাদের জীবনের কালো অধ্যায়’।

স্ত্রী, চার ছেলে-মেয়েসহ ছয় সদস্য নিয়ে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন আব্দুর রশিদ (৪৭)। আশ্রয় নেন টেকনাফের লেদায় রোহিঙ্গা শিবিরে। মিয়ানমারের গজিরবিলের বাসিন্দা এই রোহিঙ্গা নাগরিক বলেন, দুই বছর ধরে বাঁশ ও ত্রিপলের তৈরি একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন। এনজিও’র মাধ্যমে খাদ্যসামগ্রী পেলেও স্বদেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। তবে এ আশা এখনো পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, আর কত দিন বুকে এ আশা বেঁধে রাখতে হবে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। কারণ, রোহিঙ্গারা ফিরতে চাইলেও তাদের কমিউনিটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন মিয়ানমার সরকারকে। এ শর্ত মিয়ানমার সরকার মেনে না নিলে আদৌ কি স্বদেশে ফেরা হবে রোহিঙ্গাদের?

শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে সেতেরা বেগম বলেন, জম্মভূমির জন্য মায়া লাগছে। ফেলে আসা ধন-সম্পদ, ভিটে-বাড়ি, কি না ছিল আমাদের? স্বামী আব্দুল মালেককে ধরে নিয়ে হত্যা করে সেনারা। এরপর পালিয়ে আসি টেকনাফে। এরপর থেকে এখানে বসবাস করছি। পিতা হারা সন্তানদের নিয়ে কোনো রকমে বসবাস করে আসছি। এখন সেসব শুধু স্বপ্ন আর স্মৃতি মনে পড়লে কান্না আসে। কপালে কি জুটবে, মিয়ানমারে যাওয়ার সেই আশা। না কি দোঁয়াশা হয়ে থাকবে বলেন তিনি।

আলী আকবর নামে অপর রোহিঙ্গা বলেন, আমাদের দাবি মেনে না নিয়ে দুই দফা প্রত্যাবাসনের নাটক করেছে মিয়ানমার।

এ বিষয়ে টেকনাফ সরকারি কলেজের সহকারি অধ্যাপক সন্তোষ কুমার শীল বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছিল। তারা আসার পর থেকে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়েছে। তারা মিয়ানমার ফিরে গিয়ে তাদের দাবিগুলো পেশ করতে পারত। এভাবে হলে আর তাদের ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছি না।

জাদিমোরার দোকানদার জাহিদ হোসেন ও মোহাম্মদ আলম বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে খুব আশাবাদী হয়েছিলাম। রোহিঙ্গারা কি এদেশে আশ্রয় নেয়ার সময় কোনো শর্ত দিয়েছিল? তারা নিজ দেশে ফিরে যাবেন এতে আবার কিসের শর্ত। প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন না হওয়ায় আমরা খুবই উদ্বিগ্ন।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের সহকারি শালবাগানের ক্যাম্প ইনচার্জ মো: খালেদ হোসেন বলেন, গত তিনদিনে ৩৩৯টি পরিবারের মতামত নেয়া হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরতে রাজি নয়। জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হচ্ছে না। তবে প্রত্যাবাসনের তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৩৭ পরিবারের মতামত নেয়া অব্যাহত রয়েছে। সোমবার থেকে অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নেয়া হবে।

রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে দু’দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হলেও এখন পর্যন্ত দুই দফায় তা ব্যর্থ হয়েছে। দাতা দেশগুলো রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ালেও তাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখছে না।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে ঘিরে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি হয়েছিল। গত ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনের দিন রোহিঙ্গারা বলেছেন, তাদের শর্তগুলো মেনে না নিয়ে কোনো রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত যাবে না। বাংলাদেশ শুরু থেকে বলে আসছে, জোর করে কোনো রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাবে না। রোহিঙ্গা স্ব-ইচ্ছায় ফিরতে চাইলে বাংলাদেশ সবসময় প্রস্তুত রয়েছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন বলেন, গত দুই বছরে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ, অপহরণ, ডাকাতি, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে ৪৭১টি মামলায় ১ হাজার ৮৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দিন দিন রোহিঙ্গারা অপরাধে বেশি জড়িয়ে পড়ছে।

দৈনিক বগুড়া
দৈনিক বগুড়া