• বুধবার   ০৮ ডিসেম্বর ২০২১ ||

  • অগ্রাহায়ণ ২৪ ১৪২৮

  • || ০৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

অবৈধ ওষুধের রমরমা বাণিজ্য

দৈনিক বগুড়া

প্রকাশিত: ২২ মে ২০১৯  

 

দেশজুড়ে চলছে অবৈধ ওষুধের রমরমা বাণিজ্য। ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজসে ঢাকার আশপাশে গড়ে উঠেছে নিম্নমানের অনেক ওষুধ কারখানা। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায়ও নিম্নমানের ওষুধ তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। দু’একটি ওষুধের অনুমোদন নিয়ে তার আড়ালে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করছে ওইসব কোম্পানি। এর মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। ফলে হুমকির মুখে পড়ছে জনস্বাস্থ্য। ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের কিছু কর্মকর্তা নিয়মিত অবৈধ অর্থের ভাগও পাচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালকের দফতরে বেশ কিছু লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে। এসব অভিযোগপত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মালিক ও অধিদফতরের কর্মকর্তাদের নানা অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। 

অনিয়মের অভিযোগ আছে এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, সাভারের ম্যাবকো ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউনানী), সাভারের লিমিট ল্যাবরেটরিজ ইউনানী, দর্শনার ওয়েস্ট ফার্মাসিউটিক্যালস, ঢাকার মানিকনগরের হাইম্যাঙ্ ইউনানী ফার্মাসিউটিক্যালস, পাবনার এম. এইচ. ইউনানী ল্যাবরেটরিজ ও ইন্ট্রা ফার্মাসিউটিক্যালস, সিলেটের রোজমার্ক ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউনানী), বগুড়ার সবুজ ফার্মাসিউটিক্যালস (আয়ু.), যশোরের আশরাফুল ল্যাবরেটরিজ (ইউনানী), ঢাকার কদমতলীর দিহান ফার্মাসিউটিক্যালস (আয়ু.) এবং মুন্সীগঞ্জের এমপেক্স ইউনানী ল্যাবরেটরিজ। 

এর মধ্যে সাভারের ম্যাবকো ফার্মাসিউটিক্যালস ইউনানীর মালিক আলিম উদ্দিন। ম্যাবকোর অফিস সাভারের ব্যাংক টাউনে। কারখানার ঠিকানা তিনি কাউকে জানান না। এমনকি সেই অফিসের কোনো সাইনবোর্ডও ব্যবহার করেন না তিনি। এতে তার প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর থেকে ওষুধ প্রস্তুতকারক হিসেবে অনুমতি লাভ করে ক্ষতিকর ওষুধ বিক্রি করছেন আলিম উদ্দিন। কোনো প্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রসাশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজসে তৈরি করছেন পিউটনসহ অনেক ভেজাল ওষুধ। অধিদফতরের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা তার ‘প্রফিট পার্টনার’ হিসেবে এসব অবৈধ কাজে সহায়তা করছেন বলে অভিযোগে রয়েছে। 

যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারা হলেন- ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক রুহুল আমিন, সহকারী পরিচালক শফিকুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক আশরাফ হোসেন, সহকারী পরিচালক মো. ইয়াহ্ইয়া এবং ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক এটিএম গোলাম কিবরিয়া। এদের মধ্যে শফিকুল ইসলাম ঔষুধ প্রশাসনে সবচেয়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তা বলে নিজেকে জাহির করে থাকেন। এসব কর্মকর্তা মোটা অংকের মাসোহারা নিয়ে ম্যাবকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মালিক আলিম উদ্দিনের ক্ষতিকর ওষুধ পিউটনসহ অন্যান্য ওষুধের ব্যবসা চালিয়ে যেতে সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

এদিকে, ম্যাবকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মালিক আলিম উদ্দিন সম্পর্কে ওই অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি ছাত্রজীবন থেকেই শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এখন জামায়াতের সক্রিয় সদস্য। অবৈধ ও ভেজাল ওষুধ ব্যবসা করে তিনি এখন অঢেল অর্থ-বিত্তের মালিক। ডিগ্রি ছাড়াই ডাক্তারও বটে। এক সময় ঢাকার একটি ইউনানি ওষুধ কোম্পানির সহকারী পদে চাকরি করতেন। ৫ বছর আগেও যিনি অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন, কিভাবে তিনি রাতারাতি ওষুধ কোম্পানির মালিক বনে গেলেন, তা যেন রহস্য। শুধু তাই নয়, সাভারের আশুলিয়ায় কয়েক কোটি টাকার জমিও কিনেছেন আলিম। শুধু পিউটন নামের সিরাপটি বিক্রি করেই প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কোম্পানিটি। আর ওই টাকা দিয়েই নতুন করে একটি বেভারেজ কোম্পানি করার পায়তারা করছেন তিনি। তার বিশাল অর্থের ভান্ডার হলো ক্ষতিকর পিউটন সিরাপ। 

অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, কারখানার নিয়মনীতি না মেনেই আলিম উদ্দিন ২০১১ সালে পেয়ে যান ঔষুধ প্রশাসন অধিদফতরের লাইসেন্স। তিনি এখন হয়েছেন ‘বিশিষ্ট ওষধ প্রস্তুতকারক’। অথচ পিউটন নামে যে সিরাপটি তার কোম্পানি বাজারজাত করছে, সেটি নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সহকারী পরিচালক শফিকুল ইসলামের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে অধিদফতর এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয় না। বিভিন্ন সময়ে ঔষুধ প্রশাসন অনেক কোম্পানির প্রোডাক্ট পরীক্ষা করে উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধ করাসহ কারখানা সিলগালা করলেও, ম্যাবকোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। 

এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের সহকারী পরিচালক শফিকুল ইসলাম ব্যক্তিগত যোগাযোগ নেই। কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনেরও নেই। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে। তা তদন্ত হচ্ছে। কোনো ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেলে, ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জানা গেছে, পিউটন সিরাপে মূলত ডেক্সামেথাসন, সিপ্রো হেফটামাইডিন, স্টেরয়েড, পেরিঅ্যাকটিন, রেকটোভিট ও হেপরোভিট মিশিয়ে শক্তিবর্ধক, পুষ্টিবর্ধক ও পাকস্থলীর দুর্বলতা নাশক সিরাপ হিসেবে অবাধে বিক্রি করা হচ্ছে। 

পিউটন সিরাপ সম্পর্কে ওষুধ ব্যবসায়ীরা বলছেন, পিউটন খেলে মোটাতাজা হওয়া যায়। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না পিউটন সিরাপটি কতটা ক্ষতিকারক। ওই সিরাপটি বেশ কিছুদিন খাওয়ার পর শরীরে পানি জমে যায়, শরীরে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে, এমনকি কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এটি খেলে সাময়িকভাবে শরীর মোটা হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা অত্যন্ত ক্ষতিকারক। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ম্যাবকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মালিক আলিম উদ্দিন বলেন, তিনি সব ধরনের নিয়ম-নীতি মেনেই ব্যবসা করছেন। তার কোম্পানির তৈরি ওষুধ নিয়ে শতাধিক রিপোর্ট আছে। সেখানে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের নির্দেশনা অনুযায়ীই তিনি সব ধরনের ওষুধ প্রস্তুত করেন। পিউটন সিরাপে ক্ষতিকর কোনো উপাদান নেই বলেও দাবি তার। আর এক্ষেত্রে অধিদফতরের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। 

ম্যাবকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের আরেক সহকারী পরিচালক আশরাফ হোসেন। আর অধিদফতরের পরিচালক রুহুল আমিন ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ইউনানী ফার্মাসিউটিক্যালসের কোনো ফাইল আমি দেখি না। ফলে তাদের সঙ্গে আমার কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের প্রশ্নই ওঠে না। ম্যাবকোর বিষয়টি সহকারী পরিচালক শফিকুল ইসলাম তদারকি করছেন। আমার জানা মতে, এরই মধ্যে এ বিষয়ে তদন্ত হয়েছে। ফলাফল হাতে পাওয়ার পর কোনো অনিয়ম দেখা গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

এসব বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের নবনিযুক্ত মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান বলেন, আমার উদ্দেশ্য থাকবে অধিদফতরের সবাই যেন স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে। অধিদফতরের দুর্নীতি অথবা ওষুধ সংক্রান্ত যে কোনো অভিযোগকে আমি স্বাগত জানাই। কোনো অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে, কোনো অনিয়ম, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না। 

তিনি আরো বলেন, মডেল ফার্মেসির কার্যক্রম বাড়ানো, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জব্দ, সর্বোপরি জনস্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর এমন বিষয়ে জিরো টলারেন্স প্রদর্শন করবে ঔষধ প্রশাসন। দেশের ওষুধ শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার জন্য মালিক সমিতির সঙ্গেও কাজ করবেন বলে জানান তিনি।  

দৈনিক বগুড়া
দৈনিক বগুড়া