• বুধবার   ০৮ ডিসেম্বর ২০২১ ||

  • অগ্রাহায়ণ ২৪ ১৪২৮

  • || ০৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

বিদেশি ব্র্যান্ডের কৌটায় চকের প্রসাধনী

দৈনিক বগুড়া

প্রকাশিত: ৩০ মে ২০১৯  

 

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামে চলছে নকল পণ্যের অবাধ বাণিজ্য। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী স্থানীয় বিভিন্ন অবৈধ ঘুপচি কারখানায় উৎপাদিত পণ্য বিদেশি ব্র্যান্ডের লোগো লাগিয়ে নামকরা সব দোকান ও শোরুমে বিক্রি করছে। এরই মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বেশ কয়েকজনকে সাজা দেয়া হলেও থামেনি অবৈধ এসব প্রসাধনীর বিক্রি। ঈদকে সামনে রেখে তারা যেন আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। 

জানা গেছে, রাজধানীর গুলিস্তান, ফার্মগেট, মৌচাক, নিউমার্কেটসহ নামকরা শপিং মলগুলোতেও নকল ও অবৈধ প্রসাধনী সামগ্রী অবাধে বিক্রি হচ্ছে। অলিগলির কসমেটিকসের দোকানেও অধিকাংশই নকল পণ্য। আর এসব নকল ও অবৈধ প্রসাধনী আসে চকবাজারসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন অবৈধ কারখানা থেকে। সেখান থেকে ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে এসব পণ্য। 

গত সপ্তাহে প্রশাসনের অভিযানে বেশকিছু দোকানে এসব নকল ও অবৈধ প্রসাধন সামগ্রী ধরা পড়েছে। বসুন্ধরা সিটির আলমাস সুপার শপ ও মোস্তফা মার্টের মতো স্বনামধন্য শোরুমেও মিলেছে নকল পণ্য। চকবাজার ও জিঞ্জিরার নকল শ্যাম্পু ও কসমেটিকস সামগ্রী বিদেশি বলে বিক্রির অভিযোগে বসুন্ধরা সিটির আলমাস সুপার শপকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই অভিযোগে মোস্তফা মার্টকেও জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।

ওই অভিযান শেষে অধিদফতরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল জানান, বসুন্ধরা সিটির আলমাস সুপার শপ ও মোস্তফা মার্ট তাদের কসমেটিকস পণ্য, শ্যাম্পু, সাবান, ব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য বিদেশি বলে বিক্রি করছিল। কিন্তু সেসব পণ্যে কোন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা বা উৎপাদন তারিখ বা মূল্য লেখা ছিল না। ফলে দাম নিজেদের মতো করে রাখছিল। এগুলো দেখে মনে হয়েছে কেরানীগঞ্জ, জিঞ্জিরা, চকবাজার ও মৌলভীবাজার থেকে নকল কসমেটিকস এনে বিদেশি বলে বিক্রি করা হচ্ছিলো। এসব পণ্য বিষয়ে তাদের কাছে কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি। মোস্তফা মার্টের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- ওইসব পণ্য লাগেজে করে আনা হয়েছে। তবে লাগেজে করে এত পণ্য আনা সম্ভব নয়। আর এভাবে পণ্য আনলে ভেজাল হওয়ার সম্ভাবনাই থাকে বেশি। 

আলমাস সুপার শপকে এর আগেও অনেকবার নকল ও অবৈধ পণ্য রাখার দায়ে জরিমানা করা হয়েছে। তারপরও ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে তারা এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। গত বছরের ২৫ জুন অবৈধ পন্থায় আসা লাগেজ পার্টির নকল পণ্য বিক্রির দায়ে ধানমন্ডির আলমাস সুপার শপে অভিযান চালিয়ে দুই লাখ টাকা জরিমানা করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। এর তিন মাস আগেও ২১ মার্চ ওই প্রতিষ্ঠানকে একই অভিযোগে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। এছাড়া ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর গুলশান এলাকায় আলমাসের দুটি শাখায় অভিযান চালায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন-র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। তখনও সেখানে নকল, অবৈধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

নকল পণ্যের পাইকারি বাজার হিসেবে পুরান ঢাকার কিছু এলাকার পরিচিতি দেশজোড়া। গলি-ঘুপচিতে বহুতল আবাসিক ভবনে গড়ে তোলা হয়েছে প্রসাধনীর অবৈধ কারখানা ও গুদাম, যা সাংঘাতিক ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বহুযুগ ধরে পুরান ঢাকা নানা ব্যবসার কেন্দ্র। দেশীয় কোম্পানি ও আমদানি করা বিদেশি পণ্য বিক্রির কেন্দ্রও পুরান ঢাকা। ব্যবসায়ীদের হিসেবে, এই এলাকার প্রসাধনীর ব্যবসা বছরে হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়। তবে এই বিশাল অঙ্কের ব্যবসার বেশির ভাগই চলছে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অনুমোদন ছাড়া। এ এলাকায় নকল পণ্যের ব্যবসায়ীদের অবস্থান অনেক শক্তিশালী। 

জানা গেছে, গত দুই বছরে চকবাজার, লালবাগ, ইসলামবাগ, ইমামগঞ্জ ও নবাবপুর এলাকায় ১১২টি নকল পণ্যের কারখানা বন্ধ করে সিলগালা করে দিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসবের সঙ্গে যুক্ত ১৭৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তাৎক্ষণিক জরিমানা আদায় হয়েছে ৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা। 

এদিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবৈধ প্রসাধনসামগ্রী উৎপাদন ও বিক্রির অভিযোগে মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসটিআই ৯৪টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে, ৮টি কারখানা সিলগালা ও ২৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আবার প্রসাধনী ভরে (রিফিলিং) বাজারে বিক্রির জন্য রক্ষিত ১৮ ট্রাক নামী ব্র্যান্ডের প্রসাধনীর কৌটা ধ্বংস করেছে সংস্থাটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুরান ঢাকার এক ব্যবসায়ী নেতা বলেন, অলিগলিতে নকল কারখানাগুলোতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। নকল প্রসাধনীর দৌরাত্ম্যে তাদের ব্যবসা লাটে উঠতে বসেছে। এসব নকল পণ্য উৎপাদনকারীরা অনেক শক্তিশালী, সবাইকে ম্যানেজ করে চলছে তারা। মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত আসেন, কিছু শাস্তি দিয়ে চলে যান। কিন্তু অর্থদণ্ড দিয়ে একই কাজ শুরু করেন নকল পণ্যের ব্যবসায়ীরা। 

এ বিষয়ে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর সভাপতি গোলাম রহমান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, এ অবস্থা তো একদিনে তৈরি হয়নি। প্রশাসনকে একই সঙ্গে প্রতিরোধ ও আইনি ব্যবস্থাকে জোরদার করতে হবে। সেই সঙ্গে গণমাধ্যমকে আরো সোচ্চার ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান তিনি। সর্বোপরি ভোক্তাদের নকল পণ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন গোলাম রহমান। 

দৈনিক বগুড়া
দৈনিক বগুড়া