• বুধবার   ০৮ জুলাই ২০২০ ||

  • আষাঢ় ২৪ ১৪২৭

  • || ১৮ জ্বিলকদ ১৪৪১

১২

উত্তম স্বামীর গুণাবলী

দৈনিক বগুড়া

প্রকাশিত: ২৭ জুন ২০২০  

ইতোপূর্বে একটি লেখায় ইসলামের আলোকে উত্তম স্ত্রীর গুণাবলী নিয়ে আলোচনা করেছি। এখন কোরআন ও হাদিসের আলোকে স্বামীদের গুণাবলী জেনে নেই। 

একটা কথা সবসময় মাথায় রাখবেন, আপনি যখন আপনার মেয়ের বিয়ে দেবেন, তখন আপনার সামনে দু’টি উদাহরণ রাখুন। এ উদাহরণ দু’টিই আপনার সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য যথেষ্ট।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় কন্যাদের বিয়ে দেয়ার সময় যেমন বর পছন্দ করেছেন, আপনিও তেমন বর সন্ধান করুন।

এর এক উদাহরণ হলো, হজরত আলী (রা.)। তিনি ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটাত্মীয়। তিনি ছিলেন সাহসী, বাহাদুর, কর্মঠ এবং অদ্বিতীয় ও অতুলনীয়। আল্লাহ তায়ালা তাকে সিংহের হৃদয় দান করেছিলেন। কষ্ট সহ্যকারী শরীর দান করেছিলেন। দায়িত্ব সচেতন ব্যক্তিত্ব দান করেছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা, আল্লাহ তায়ালা তাকে ইলমের দরিয়া দান করেছিলেন।  আমাদেরও উচিত, মেয়ে বিয়ে দেয়ার জন্য এমন বর তালাশ করা। সাহসী, সচেতন, ব্যক্তিত্ববান এবং অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছেলে খোঁজ করা। যেমনটি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চয়ন করেছেন। এরচেয়ে উত্তম উদাহরণ আর দ্বিতীয়টি হতে পারে না।

দ্বিতীয় উদাহরণ হলো হজরত ওসমান গণী (রা.)। তিনি ছিলেন বিশাল ব্যবসায়ী, ধনাঢ্য এবং সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। ইসলাম পূর্বের সমাজেও তিনি ছিলেন সর্বজনমান্য, ভদ্র এবং লজ্জাশীল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, উসমান গণীর লাজুকতা দেখে আল্লাহর ফেরেশতাও লজ্জা পায়।

মেয়ে বিয়ে দেয়ার জন্য কেমন বর চাই, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নমুনা দেখিয়ে দিয়েছেন। এরচেয়ে উত্তম উদাহরণ ও নমুনা আর পাবেন না। সুতরাং আপনিও যখন মেয়ে বিয়ে দেবেন, এ উদাহরণ দু’টি সামনে রাখুন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মধ্যে যেসব গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যাবলী দেখেছেন, আপনিও তা সন্ধান করুন। সেগুলোকে প্রাধান্য দিন।

যাহোক, স্বামীদের গুণাবলীর মধ্য হতে অন্যতম একটি গুণ হলো সহনশীল হওয়া। কারণ সে পরিবারের প্রধান। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান যদি কথায় কথায় বিগড়ে যায়, মেজাজ খারাপ করে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান কখনো প্রতিষ্ঠিত হবে না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,

ولرجال عليهن درجة

পুরুষরা নারীর অভিভাবক। আল্লাহ তায়ালা পুরুষদেরকে নারীদের চেয়ে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। তাদেরকে পরিবারের কর্তা ও প্রধান বানিয়েছেন।

পুরুষ হলো সংসারের রাজা। আর নারী হলো সংসারের রানি। এজন্য পুরুষের সহনশীল ও ধৈর্যশীল হওয়া একান্ত জরুরি।

আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন, পুরুষের মধ্যে সহনশীলতা না থাকলে কথায় কথায় ঝগড়া লাগে। সামান্য বিষয় নিয়েও মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়।

তরকারিতে লবণ হয়নি কেন?
খাবার ঠাণ্ডা কেন?
অমুক কাজটি এখনো করনি কেন?

বেচারি বিবি সারাদিন ঘরের কাজ করে করে ক্লান্ত, এজন্য দু’টো মিঠা কথা নেই। একটু প্রশংসা বা সমবেদনা নেই। সামান্য কি কম-বেশি হয়েছে, এর জন্যই মেজাজ গরম হয়ে গেছে। চেহারার দিকে আর তাকানো যাচ্ছে না।

মনে রাখবেন, স্বামীর মধ্যে সহনশীলতা না থাকলে দাম্পত্যজীবন তিক্ত হয়ে ওঠবে। সাধারণ সাধারণ বিষয় নিয়েও মনোমালিন্য সৃষ্টি হবে। বিয়ে বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়াবে। এজন্য স্বামীকে অবশ্যই সহনশীল হতে হবে। ধৈর্যশীল হতে হবে।

গত বছরের কথা। সুইডেন গিয়েছিলাম। সেখানে এক দম্পতির তালাকের ঘটনা শুনলাম। স্বামী কিচেনে এসে ব্রাশ করে। স্ত্রী তাকে এমনটি করতে নিষেধ করে। কিন্তু স্বামী স্ত্রীর নিষেধ শোনে না, জেদ ধরে সেখানেই ব্রাশ করে। এ বিষয় নিয়েই তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। অবশেষে ছাড়াছাড়িও হয়ে যায়। ঘটনা শুনে আমি তো হতভম্ব! এটা কি তালাক হওয়ার মতো কোনো ঘটনা! উভয়ে একটু ছাড় দিলে, একটুখানি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিলে এই ঘটনা ঘটে না। সংসার ভাঙ্গে না।

মোটকথা, ধৈর্য ও সহনশীলতা না থাকলে মানুষের পক্ষে সফল ও সুন্দর জীবনের অধিকারী হওয়া সম্ভব নয়। পরিবারের সবাই এক সঙ্গে থাকলে ঝগড়া হতেই পারে। ছেলে-মেয়ে মা-বাবার অবাধ্য হতে পারে। মা-বাবাও ছেলে-মেয়ের ওপর অসন্তুষ্ট হতে পারে। সৃষ্টি হতে পারে নানা রকম সমস্যাও। আর এসব সমস্যা কেবল সেই সমাধান দিতে সক্ষম, যার মধ্যে ধৈর্য রয়েছে। সহনশীলতা রয়েছে।

মোটকথা, ধৈর্য ও সহনশীলতা পুরুষের অন্যতম একটি মৌলিক গুণ। যার মধ্যে এই গুণ রয়েছে, কেবল সেই তার পরিবারকে সুন্দর ও সুচারুরূপে পরিচালনা করতে পারবে। সংসারকে শান্তি ও সুখের বানাতে পারবে। স্বামীর দ্বিতীয় গুণ ও বৈশিষ্ট্য হলো, পরিবারের দায়িত্ব পালন করা। কামচোরা না হওয়া। ফাঁকিবাজ না হওয়া।

এক্ষেত্রেও আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হলো আমাদের প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি যুগের নবী হয়েও নিজ হাতে সংসারের কাজ করতেন। স্ত্রীদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন।

হজরত মুসা (আ.) সফরে বের হয়েছেন স্ত্রীকে নিয়ে। পথিমধ্যে স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মুসা (আ.) চুপ মেরে বসে থাকেননি। নবী হওয়ার বড়াই দেখাননি। তিনি স্ত্রীকে সান্তনা দিয়ে বললেন, তুমি একটু অপেক্ষা কর, আমি আগুন নিয়ে আসছি।

فَقَالَ لِأَهْلِهِ امْكُثُوا إِنِّي آنَسْتُ نَارًا

‘আমি তোমার জন্য আগুন খুঁজে আনছি।’ (সূরা: তোহা, আয়া: ১০)।

দেখুন, যুগের নবী হয়েও স্ত্রীর আরামের জন্য আগুনের খোঁজে বের হয়েছেন। এটা কত বড় ইবাদত তা এ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয়। নবী হয়েও স্ত্রীর সাহায্যের জন্য, আরামের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এজন্য সংসারের কাজ দেখে ভয় পাওয়া উচিৎ নয়। পলায়ন করা উচিৎ নয়।

মনে রাখবেন, ছোট ছোট পাথর একত্র হয়ে যেমন পাহাড় হয়, ছোট ছোট সমস্যাও একত্র হতে হতে বিরাট আকার ধারণ করে। মতানৈক্য ও মনোমালিন্যের পাহাড় হয়ে যায়। দু’জনের মধ্যে বিভেদের দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। ফলে ঘর ভাঙে, সংসার ধ্বংস হয়। অনেক সময় দেখা যায় কয়েক যুগ ঘর-সংসার করার পরও ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়।

আপনি স্বামী। আপনি যদি মনে করেন, আপনার স্ত্রী আপনার সেবিকা হয়ে থাকুক, তবে আপনারও দায়িত্ব, স্ত্রীর সমস্ত চাওয়া-পাওয়া ও প্রয়োজন পূরণ করা। ভারসাম্য তখনই প্রতিষ্ঠ হয়, যখন স্বামী-স্ত্রী নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করার ব্যাপারে সচেতন হয়। আন্তরিক হয়।

শরীয়ত উভয়ের মধ্যে একটা মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। স্বামীর দায়িত্ব হলো সে স্ত্রীর হক আদায় করবে। আর স্ত্রীর দায়িত্ব হলো সে স্বামীর হক আদায় করবে। স্বামী-স্ত্রী যদি পরস্পর পরস্পরের হক আদায় করে এবং নিজ নিজ জিম্মাদারী ও দায়িত্ব পালন করে তাহলে উভয়ে সুখময় জীবনের অধিকারী হবে। তাদের সংসার শান্তির হবে। আর দাম্পত্য জীবনের চাওয়াও এটাই। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন,

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ 

‘তাঁর নিদর্শনসমূহ হতে একটি নিদর্শন হলো। তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদেরকে সৃষ্টি করেছেন। যাতে করে তোমরা তাদের দ্বারা প্রশান্তি লাভ করতে পার। এবং তোমাদের মধ্যে দয়া ও ভালবাসা সৃষ্টি করেছেন। এতে চিন্তাশীলদের জন্য রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শন।’ (সূরা: রূম, আয়াত: ২১)।

পবিত্র কোরআন থেকে আমরা স্পষ্টভাবে জানতে পারলাম, দাম্পত্যজীবনের একমাত্র চাওয়া হলো স্বামী-স্ত্রীর মিল-মহব্বত এবং প্রেম-ভালবাসাপূর্ণ ঘর-সংসার করা। শান্তিময় জীবন যাপন করা। আর প্রকৃত শান্তির ঘর সেটাই, যেখানে স্বামীও সুখে থাকে, স্ত্রীও সুখে থাকে। স্বামী-স্ত্রীর কোনো একজনও যদি সুখী না হয়, শান্তিতে না থাকে, তার অর্থ হলো সে ঘর শান্তির ঠিকানা নয়।

বর্তমানে আমাদের প্রত্যেকের ঘরেই অশান্তি। কোথাও স্বামী স্ত্রীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। কোথাও স্ত্রী স্বামীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। স্বামী হয়েও পরিবারে কাজের মানুষের মতো লাঞ্ছনাকর জীবন যাপন করছে। এর মূল কারণ শরীয়ত সম্পর্কে আমাদের সঠিক জ্ঞান না থাকা, শরীয়ত অনুযায়ী আমল না থাকা।

আমরা ঘর-সংসারের মূল উদ্দেশ্য ভুলে আছি। ছোট ছোট সমস্যা নিয়ে মাতামাতি করি। ঝগড়া-বিবাদ করি। আমাদেরকে আরো সচেতন হতে হবে। সংসারকে শান্তিময় করতে ছোট ছোট সমস্যা ভুলে যেতে হবে। ছেড়ে দিতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।

সুখময় দাম্পত্যজীবন:

পবিত্র কোরআন স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছে, আজ পর্যন্ত অন্য কোনো ধর্ম ও সমাজ তা দিতে সক্ষম হয়নি। পবিত্র কোরআন স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক এভাবে উপস্থাপন করেছে,

هُنَّ لِبَاسٌ لَكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَهُنَّ

‘তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।’ (সূরা: বাকারা, আয়াত: ১৮৭)।

পোশাকের সঙ্গে তুলনা করার দু’টি কারণ রয়েছে। এক. পোশাক দ্বারা মানুষের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। পোশাক দ্বারা মানুষের দোষ-ত্রুটি গোপন থাকে। দ্বিতীয়ত. মানুষের শরীরের সবচেয়ে কাছে থাকে পোশাক। তো স্ত্রীকে স্বামীর পোশাক বলা হয়েছে এবং স্বামীকে স্ত্রীর পোশাক বলা হয়েছে। অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী একজন আরেকজনের অতি কাছের মানুষ। স্বামী-স্ত্রীর একজন আরেকজনের কাছের হওয়ার বিষয়টি আল্লাহ তাআলা কী অপূর্বভাবে প্রকাশ করেছেন। আল্লাহ আকবার!

হাদিসে বর্ণিত আছে, হজরত হাওয়া (আ.)-কে হ-রত আদম (আ.) এর পাঁজর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। মাথা থেকে সৃষ্টি করা হয়নি কেন? পা থেকে সৃষ্টি করা হয়নি কেন? মাথা থেকে সৃষ্টি করা হয়নি যাতে স্ত্রী স্বামীর মাথায় উঠে না থাকে। পা থেকে সৃষ্টি করা হয়নি যাতে স্বামী স্ত্রীকে পায়ের নিচে ফেলে না রাখে। আল্লাহ তায়ালা পাঁজর থেকে সৃষ্টি করেছেন যাতে স্বামী স্ত্রীকে জীবনের সাথী বানিয়ে রাখে। হৃদয়ের রানি বানিয়ে রাখে। দেখুন, পবিত্র কোরআন এ কথা বলেনি যে, তোমরা জীবন যাপন কর। বরং আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

‘তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে উত্তমরূপে জীবন যাপন কর।’ (সূরা: নিসা, আয়াত: ১৯)।

কোরআনের ব্যাখ্যাকাররা লিখেছেন, স্ত্রীদের ওপর আল্লাহ তায়ালার বিশাল রহমত যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের পক্ষ থেকে স্বামীদের নিকট সুপারিশ করেছেন। আল্লাহু আকবার!

দৈনিক বগুড়া
দৈনিক বগুড়া
ধর্ম বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর