সংগৃহীত
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ফাঁকি দেওয়া ১ হাজার ৩৬২ কোটি ৪৯ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব পরিশোধে গড়িমসি করছে। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, সরকারের খাতায় প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর মোটা অঙ্কের মুনাফা করে যাচ্ছে। শুধু গত পাঁচ বছরেই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে।
তা সত্ত্বেও ২০১৭-২০১৮ সালের পাওনা রাজস্ব আদায়ে বারবার তাগিদ দিয়েও আদায় করতে পারছে না চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। যদিও প্রথম পর্যায়ে প্রকৃত পাওনা ছিল ১ হাজার ৫৬২ কোটি ৪৯ লাখ ৫৯ হাজার ৮৬৩ টাকা, যার মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ২০০ কোটি টাকার মতো রাজস্ব পরিশোধ করেছে। তবে, বাকি বকেয়া রাজস্ব পরিশোধে গড়িমসি করছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম।
বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ১ হাজার ৩৬২ কোটি ৪৯ লাখ টাকার বেশি শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে তা পরিশোধে গড়িমসি করছে। কাস্টমস বিভাগ বকেয়া রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার জন্য বারবার তাগিদ দিলেও প্রতিষ্ঠানটি তা আমলে নিচ্ছে না। প্রথম পর্যায়ে পাওনা ১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে
বিষয়টি নিশ্চিত করে কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, কাস্টমস আইন অনুযায়ী আমদানি বা রপ্তানি করা সব পণ্যের ওপর প্রথম তফসিল বা আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনের অধীন নির্ধারিত হারে শুল্ক প্রদেয় হয়। সার্বিক পর্যালোচনায় আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, আগাম কর ও আয়কর আমদানি পর্যায়েই পরিশোধযোগ্য। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি তা পরিশোধ করেনি। ইতোমধ্যে চূড়ান্ত দাবিনামা অনুসারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অপরিশোধিত রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে এবং তাগিদও দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বকেয়া রাজস্ব জমা হয়নি।
এনবিআর ও কাস্টমসের তাগিদপত্র সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড এবং স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড আমদানি করা পণ্যচালানের বিপরীতে ঠিকমতো শুল্ক-কর পরিশোধ করছে না। এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেয়ে শুল্ক-কর আদায়ে গঠিত কমিটির দাখিল করা প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ৪৬৩টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে প্রাপ্ত অপরিশোধিত রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৬২ কোটি ৪৯ লাখ ৫৯ হাজার ৮৬৩ টাকা। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করায় বর্তমানে অবশিষ্ট বকেয়ার পরিমাণ ১ হাজার ৩৬২ কোটি ৪৯ লাখ ৫৯ হাজার ৮৬২ টাকা।
বকেয়া বা ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পরিশোধ না করার বিষয়ে জানতে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহীরুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অপরিশোধিত রাজস্ব আদায়ে ইতোমধ্যে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হলে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি শুনানিতে উপস্থিত হয়ে লিখিত ও মৌখিক জবাব দেন। তারা পরিশোধিত অর্থের হিসাব যথাযথ নয় বলে স্বীকার করলেও ইনভয়েস ভ্যালুর ভিত্তিতে দাবিনামা নির্ধারণে শুধুমাত্র কাস্টমস ডিউটি প্রযোজ্য হওয়া উচিত বলে মত দেন। একই সঙ্গে প্রকৃত পরিশোধযোগ্য রাজস্ব নির্ধারণে পৃথক কমিটি গঠনেরও প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড কাস্টমস আইন অনুযায়ী জারি করা দাবিনামার বিষয়ে পত্র দেয়। কাস্টমস আইন ১৯৬৯, মূল্য সংযোজন কর আইন ২০১২ এবং আয়কর আইন ২০২৩-এর বিধান অনুযায়ী আমদানি পর্যায়েই কাস্টমস ডিউটি, ভ্যাট, আগাম কর এবং অগ্রিম আয়কর পরিশোধ বাধ্যতামূলক।
এ অবস্থায় কাস্টমস আইন, ১৯৬৯-এর ধারা ৮৩ (ক) (সংশোধিত আইনে ধারা ৯১ (৩)) অনুযায়ী বকেয়া রাজস্ব বাবদ ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকার বেশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাগিদপত্রে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না হলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানিয়েছে কাস্টমস বিভাগ।
মোটা অঙ্কের শুল্ক ফাঁকি দিলেও মেঘনা পেট্রোলিয়াম বিগত বছরগুলোতে বিপুল মুনাফা অর্জন করেছে। গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা কর-উত্তর মুনাফা করেছে, যার গড় প্রতি বছর প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। মোটা মুনাফার আড়ালে এই বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে
বকেয়া বা ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পরিশোধ না করার বিষয়ে জানতে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহীরুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড প্রায় প্রতি বছরই মুনাফা করে থাকে। বিগত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বিবেচনা করলে দেখা যায়, গড়ে সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। প্রতি বছরই দ্বিগুণ ও তিনগুণ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে কর-উত্তর মুনাফা করেছিল ৬৬৪ কোটি ৩২ লাখ ১৯ হাজার টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর-উত্তর মুনাফা ৫৪২ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর-উত্তর মুনাফা ৪৪২ কোটি ১৪ লাখ টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে মুনাফা ৩১৬ কোটি ৫৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে কর-উত্তর মুনাফা করেছিল ২৮২ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
















