রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

প্রতিমা, আলোকসজ্জা আর বর্ণিল আয়োজনে দুর্গোৎসব শুরু সাতক্ষীরায়

প্রতিমা, আলোকসজ্জা আর বর্ণিল আয়োজনে দুর্গোৎসব শুরু সাতক্ষীরায়

সংগৃহীত

সাতক্ষীরায় শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ৫ দিনের এ উৎসবে জেলার ৬১২টি মণ্ডপে চলছে নানা আয়োজন। প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা ও আলোকসজ্জায় বৈচিত্র্য এনেছেন আয়োজকেরা। কোথাও মুক্তা-পুঁতি, কোথাও পাটের আঁশ, আবার কোথাও তিল ও মুগ ডাল দিয়ে সাজানো হয়েছে প্রতিমা।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবার সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় ৬১২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ১১১টি, তালায় ২০২টি, কলারোয়ায় ৪৬টি, দেবহাটায় ২১টি, আশাশুনিতে ১০৬টি, কালীগঞ্জে ৫৫টি এবং শ্যামনগরে ৭১টি মণ্ডপ রয়েছে। আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে দুর্গোৎসব। এরই মধ্যে পূজার আনুষ্ঠানিকতা ও দর্শনার্থীদের বরণে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন আয়োজকেরা।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ব্রহ্মরাজপুর সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে প্রতিমার অলংকার ও সাজসজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা। সূক্ষ্ম কারুকাজে সাজিয়ে তোলা হয়েছে প্রতিমার পোশাক ও অলংকার।

আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা কাছারিপাড়া পূজামণ্ডপে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কেজি মুগ ডাল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমা। এ কাজ সম্পন্ন করতে শিল্পীদের সময় লেগেছে প্রায় ১৫ দিন।

একই উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা দিয়ে সাজানো হয়েছে ১৩টি প্রতিমা। শিল্পী প্রকাশ মণ্ডল ও তাঁর দলের তৈরি এ সাজে ব্যয় হয়েছে চার লাখ টাকার বেশি।

পাটের আঁশ দিয়ে প্রতিমা সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে পাটকেলঘাটার কেশবলাল ঘোষ মহাশ্মশানে। সেখানে এবারই প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। পাঁচ মণের বেশি পাটের আঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে দুর্গাপ্রতিমা। দেবীর অবয়ব ও পোশাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পাটের নান্দনিক ব্যবহার। প্রতিমার দুই পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ এবং নিচে মহিষাসুরের প্রতিকৃতি রয়েছে। পেছনে রাখা হয়েছে বড় গোলাপি পদ্ম ও আলপনার নকশা।

আয়োজক কমিটির সদস্য দেবদাস কর্মকার বলেন, সোনালি আঁশ পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্য। একসময় পাট রপ্তানি করে দেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করত। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং পাটকে নতুনভাবে পরিচিত করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, কলারোয়া পৌরসভার উত্তর মুরারীকাটি পালপাড়া পূজামণ্ডপে প্রায় ২৫ কেজি সাদা তিল দিয়ে সাজানো হয়েছে ১৬টি প্রতিমা। প্রচলিত সাজের বাইরে তিলের ব্যবহার প্রতিমাগুলোতে এনেছে ভিন্নতা।

সাতক্ষীরা শহরের কেন্দ্রীয় মন্দির ‘মায়ের বাড়ি’তে শতাধিক প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে পৌরাণিক কাহিনি ও দেবদেবীর নানা লীলা। কালীগঞ্জ উপজেলার অমিয়ান বাথুয়াডাঙ্গা সার্বজনীন দুর্গামণ্ডপে ককশিট দিয়ে প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি থাকছে ভাসমান সেতু, বিশেষ আলোকসজ্জা ও ডিজিটাল আলোক প্রদর্শনীর আয়োজন। অষ্টমী, নবমী ও দশমীতে এ প্রদর্শনীর পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো আয়োজনের বাজেট ধরা হয়েছে আট থেকে ১০ লাখ টাকা।

শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের আরপাঙ্গাশিয়া রাসমন্দিরে কর্ণফুলী টানেলের আদলে তৈরি করা হয়েছে দর্শনার্থীদের চলাচলের পথ। একই উপজেলার দক্ষিণ বড়কুপট নদীরপাড় দুর্গামন্দিরে মাটি ও ফাইবারের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার দুর্গাপ্রতিমা। সেখানে দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগ, শিবের তাণ্ডব ও বীরভদ্রের আবির্ভাবসহ পৌরাণিক ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

আশাশুনি উপজেলার খাজরা ইউনিয়নের ঘুঘুমারি শুরেরাবাদ সার্বজনীন মন্দিরে ফাইবারের প্রতিমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ঝরনার পানি। সাতক্ষীরা সদরের মাগুরা কর্মকারপাড়ার কালীমন্দিরে ‘কৈলাস অনাদি মহাদেব’ ভাবনায় মণ্ডপ সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে কৈলাসের আবহ, প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার শিবলিঙ্গ ও পঞ্চনাগের প্রতিকৃতি থাকছে।

দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাতক্ষীরা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে মণ্ডপগুলোতে টহল, সিসিটিভি নজরদারি, সাদা পোশাকে পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের উপস্থিতি এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়ন (৩৩ বিজিবি) থেকে সাতক্ষীরা সদর ও কলারোয়ার ৩৮টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় ১৫ প্লাটুনের ৩০০ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পবিত্রতা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে যথাযথ নিয়মে পূজা আয়োজনের জন্য মণ্ডপ কমিটিগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশ-প্রশাসনসহ সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম বলেন, দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রস্তুতি নিয়েছে। মণ্ডপগুলোতে নজরদারি ও টহল জোরদার করা হবে। উৎসব শান্তিপূর্ণ রাখতে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

বৈচিত্র্যময় প্রতিমা, ব্যতিক্রমী উপকরণ ও নান্দনিক মণ্ডপসজ্জায় সাতক্ষীরায় দুর্গোৎসব ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ। আয়োজকদের প্রত্যাশা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সবার সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে এবারের দুর্গোৎসব।

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

জনপ্রিয়

সর্বশেষ:

শিরোনাম: