সংগৃহীত
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষি খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের ক্ষুদ্র কৃষকদের সহায়তায় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিলেই হবে না। সেই তথ্য কাজে লাগিয়ে কৃষকেরা যেন ফসল ও খামার রক্ষায় সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন সেই ব্যবস্থাও করতে হবে। কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার নিয়েও সতর্ক করেছেন তারা।
আগামী ৯ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ ৩১। সম্মেলন সামনে রেখে সম্প্রতি আয়োজিত এক ওয়েবিনারে কৃষি খাতে জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষুদ্র কৃষকদের অভিযোজন সক্ষমতা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হয়। এতে অংশ নেন মরক্কোর বিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা নেটওয়ার্ক সিজিআইএআরের নির্বাহী ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসমাহানে এলুয়াফি এবং সংস্থাটির জলবায়ু কার্যক্রমের পরিচালক টড রোজেনস্টক।
কৃষি ও খাদ্য খাত থেকে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৩৩ শতাংশ হয়। অথচ সরকারি উৎস থেকে দেওয়া মোট জলবায়ু অর্থায়নের মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ যায় কৃষি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা খাতে। ওয়েবিনারে ইসমাহানে এলুয়াফি বলেন, কৃষি ও খাদ্য খাত যদি বৈশ্বিক নিঃসরণের ৩৩ শতাংশের জন্য দায়ী হয় তাহলে এই খাতের নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অর্থায়নও বাড়ানো প্রয়োজন।
পূর্বাভাস থেকে বাস্তব পদক্ষেপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খরা, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দিয়ে কৃষকের ক্ষতি কমানো সম্ভব নয়। পূর্বাভাসের তথ্য কাজে লাগিয়ে কৃষকেরা যেন সময়মতো প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন সেই ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
সিজিআইএআরের জলবায়ু কার্যক্রমের পরিচালক টড রোজেনস্টক বলেন, ‘কৃষকেরা পূর্বাভাস খেয়ে বাঁচেন না।’ তার মতে, খরা বা বন্যার পূর্বাভাস তখনই কাজে আসে যখন তা কৃষকের ফসলের ক্ষতি কমাতে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করে।
এর উদাহরণ হতে পারে এল নিনো। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার এই আবহাওয়াগত পরিস্থিতি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ধরনে পরিবর্তন আনতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকেরা বীজ বপনের সময় পরিবর্তন করতে পারেন। আবহাওয়ার সঙ্গে উপযোগী ফসল নির্বাচন করতে পারেন। পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনা ও গবাদিপশুর পরিচর্যাতেও পরিবর্তন আনতে পারেন। তবে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের পাশাপাশি অর্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা থাকা জরুরি।
রোজেনস্টকের মতে, বিজ্ঞানীরা জলবায়ু ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম তথ্য দিতে পারেন। সরকার সেই তথ্যের ভিত্তিতে কৃষকদের জন্য উপযোগী নীতি প্রণয়ন ও প্রস্তুতিমূলক বিনিয়োগ করতে পারে। উন্নয়ন ব্যাংকগুলোও জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কৃষকদের আস্থা অর্জন করতে হবে। তাদের কাছে সহজে বোধগম্য উপায়ে তথ্য পৌঁছে দেওয়াও জরুরি।
ক্ষুদ্র কৃষকদের অভিযোজনকে অগ্রাধিকার
জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া — দুই ধরনের উদ্যোগেই বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবে ইসমাহানে এলুয়াফির মতে, উন্নয়নশীল দেশের ক্ষুদ্র কৃষকদের সহায়তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি বলেন, কৃষিব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হলে প্রথমে কৃষকদের জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র কৃষকদের এমন সহায়তা দিতে হবে যাতে তারা বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয় এমন চাষাবাদ পদ্ধতি থেকে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে যেতে পারেন।
অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। উন্নত বীজ, সেচব্যবস্থা ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ব্যবহার করে একই জমিতে বেশি ফসল উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু উৎপাদন বাড়াতে অনেক ক্ষেত্রে নতুন জমি পরিষ্কার করে চাষের পরিমাণ বাড়ানো হয়। এতে বন ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হয়।
এলুয়াফির পরামর্শ হলো, নতুন জমি চাষের আওতায় আনার বদলে বর্তমানে ব্যবহৃত জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। উন্নত বীজ, সেচব্যবস্থা ও কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এটি সম্ভব। একইভাবে উন্নত পশুখাদ্য ও টিকা ব্যবহারের মাধ্যমে গবাদিপশুর উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো যায়। এতে দুধ উৎপাদনও বাড়তে পারে।
সব অঞ্চলে একই প্রযুক্তি কার্যকর নয়
কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও সব অঞ্চলে একই সমাধান কার্যকর হয় না। স্থানীয় আবহাওয়া, জমির ধরন, পানির প্রাপ্যতা এবং কৃষকের সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে প্রযুক্তি নির্বাচন করতে হয়।
রোজেনস্টক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ধানখেতে মিথেন নিঃসরণ কমানোর একটি পদ্ধতির উদাহরণ দেন। এ পদ্ধতিতে ধানখেতে সব সময় পানি জমিয়ে রাখা হয় না। নির্দিষ্ট সময় পর জমি শুকিয়ে আবার পানি দেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে পানি দেওয়া ও জমি শুকিয়ে রাখার এই পদ্ধতি ধানচাষ থেকে মিথেন নিঃসরণ কমাতে সাহায্য করে।
তবে সব জমিতে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। অনেক কৃষক নিজেরা সেচের পানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী জমির পানি কমানো বা বাড়ানো তাদের পক্ষে কঠিন। তাই কোনো প্রযুক্তি চালুর আগে স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
কৃষিতে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে সতর্কতা
কৃষিতে এআইয়ের ব্যবহার নিয়েও ওয়েবিনারে আলোচনা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইয়ের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে যে তথ্য দিয়ে মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে তার ওপর। কিন্তু এখন পর্যন্ত এআই মডেল তৈরিতে ব্যবহৃত অনেক তথ্যের মধ্যে আফ্রিকা, এশিয়া ও আমেরিকার ক্ষুদ্র কৃষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও চাহিদার যথেষ্ট প্রতিফলন নেই।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট
.jpg)



















