• রোববার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||

  • আশ্বিন ৫ ১৪২৭

  • || ০২ সফর ১৪৪২

৫৭

রাদারফোর্ডের নিউক্লিয়াস

দৈনিক বগুড়া

প্রকাশিত: ২৬ মে ২০২০  

বাবা স্কটিশ, মা ব্রিটিশ। কিন্তু বাস করেন নিউজিল্যান্ডে। এমন এক পরিবারেই ১৮৭১ সালে জন্ম নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানের জনক আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের। বেড়ে ওঠা লেখাপড়া নিউজিল্যান্ডেই। ১৮৯৪ সালে এমএসসি। সেসময়ই একটি যন্ত্র বানালেন। যেটা বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু আবিষ্কার করেছিলেন আরও আগেই। পেটেন্ট রাইট নেননি, তাই আবিষ্কারকের মর্যাদা পাননি জগদীশ বসু। অন্যদিকে সেই একই বছর বেতার যন্ত্রের আবিষ্কারক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে গেলেন ইতালিয়ান উদ্ভাবক মার্কোনি। সুতরাং রাদারফোর্ডের ভাগ্যেও জুটল না রেডিও আবিষ্কারকের তকমা।

কলেজের পাঠ চুকালেন রাদারফোর্ড। গণিত আর পদার্থবিজ্ঞানেও দখল নিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু এমএসসি করার পরই সিদ্ধান্ত নিলেন ডাক্তারি পড়বেন। কারণ শিক্ষকদের কাছ থেকে গণিত কিংবা পদার্থবিজ্ঞান কোনোটাতেই উৎসাহ পাননি। শেষমেষ তাই স্কটল্যান্ডের পিতৃভূমিতে ফিরতে চান। সেখানে তাঁর বন্ধু স্টিভেনসন থাকেন। তিনি রাদারফোর্ডকে মানা করে দিলেন যেন স্কটল্যান্ডে না আসেন। কারণ সেখানকার পরিস্থিতি ভালো নয়। তখন রাদারফোর্ড আবার পদার্থবিজ্ঞানের দিকে মুখ ফেরালেন। ভাবলেন কেমব্রিজে পড়তে যাওয়ার কথা। এজন্য টাকা চাই। বৃত্তির ব্যাপারে রাদারফোর্ডের সুনাম ছিল। তিনি স্কুল-কলেজের প্রায় প্রতিটা পর্বে বৃত্তি পেয়েছেন। সুতরাং ইংল্যান্ডেও একটি বৃত্তির আবেদন করলেন। এজন্য অবশ্য পরীক্ষায় দিতে হয়েছিল লন্ডনে।

প্রতিবছর সেই পরীক্ষায় অনেকেই অংশ নিত। কিন্তু বৃত্তি দেওয়া হত একজনকে। রাদারফোর্ড সেই পরীক্ষায় দ্বিতীয় হন। তাই তাঁর বৃত্তির পাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু কখনো কখনো ভাগ্যও বোধহয় সহায় হয়। রাদারফোর্ডেরও হয়েছিল। যে ছেলেটি বৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন, কোনো এক কারণে তিনি সেটা নেননি। তাই রাদাফোর্ডের ভাগ্যের শিকেটা ছিঁড়ে যায়। তিনি বৃত্তি পান এবং পেয়ে যান ইংল্যান্ডে পড়ার সুযোগ।

১৮৯৫ সালে রাদারফোর্ড ইংল্যান্ডে পৌঁছান। তখন কেমব্রিজের ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরির অধ্যাপক ছিলেন জে জে থমসন। থমসন তখনও ইলেকট্রন আবিষ্কার করেননি। রাদারফোর্ড থমসনের সঙ্গে পিএইচডি গবেষক হিসেবে যোগ দিলেন। এক্স রশ্মি নিয়েই গবেষণা শুরু করলেন রাদারফোর্ড। ১৮৯৭ সালে পদার্থের তেজস্ক্রিয় ধর্ম আবিষ্কার হয়। রাদারফোর্ড তখন তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। বলতে গেলে তেজস্ক্রিয় বিজ্ঞানে রাদাফোর্ডের ভূমিকা অনেক বড়। আলফা ও বিটা রশ্মির নামকরণ তিনিই করেন। তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে এই অধ্যায়ে আমরা বেশি আলোচনা করতে চাই না। পরে তেজস্ক্রিয় রশ্মি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

ক্যাভেনডিশ ল্যাবরেটরির খ্যাতি তখন জগৎজোড়া। নতুন করে সেটাকে ঢেলে সাজিয়েছেন থমসন। পরীক্ষা-নিরীক্ষামুলক গবেষণার জন্য তখন এটাই বিশ্বের সেরা। রাদারফোর্ড অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই থমসনের মন জয় করে নিলেন। তাঁর কাজ, বুদ্ধিমত্তা আর জ্ঞানের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল ব্রিটেনের বৈজ্ঞানিক সমাজে। অল্পদিনেই রাদারফোর্ড হয়ে ওঠেন প্রভাবশালী বিজ্ঞানী।

১৮৮৯ সাল। কানাডার ম্যাগগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে সে বছর একজন অধ্যাপকের পদ খালি হয়। রাদারফোর্ড সিদ্ধান্ত নেন সেখানে যোগ দেবেন। এটা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। ক্যামব্রিজের জগৎজোড়া, বিখ্যাত ল্যাবরেটরি, যশ-প্রতিপত্তি ছেড়ে তুলনামুলক অখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সচারচর কেউ হতে চান না। রাদাফোর্ড তাঁর শিক্ষক থমসনের কাছ থেকে একটা সুপারিশপত্র পেলেন। রাদাফোর্ডকে উচ্ছ্বসিত প্রসংশা করেই থমসন সুপারিশপত্রটা লিখেছিলেন। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ও তাই রাদাফোর্ডকে নিয়োগ দেয়।

রাদারফোর্ডের বিখ্যাত কাজ হলো স্বর্ণপাত পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই তিনি পরমাণুর ভেতরে নিউক্লিয়াসের সন্ধান পেয়েছিলেন। কিন্তু তবে নিউক্লিয়াস ধারণার প্রবক্তা তিনিই প্রথম নন। প্রথম নিউক্লিয়াসের কথা বলেন জাপানি বিজ্ঞানী হান্তারো নাগওকা।

১৯০৪ সাল। ততদিনে পরমাণুর দুটি মডেল আত্মপ্রকাশ করেছে। একটা টমসনের কিসমিস মডেল। আর ফিলিপ লেনার্ডের পারমাণবিক মডেল। সত্যি বলতে কণা জগতে নিউক্লিয়াসের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় এই দুই মডেল থেকে। তাই এই বইয়েও মডেল দুটি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

হান্তারো নাগওয়াকাই প্রথম পরমাণুকে সৌরজগতের মতো করে পরমাণু মডেল সাজালেন। তিনি প্রস্তাব করলেন, পরমাণুর ঠিক কেন্দ্রে থাকে ধনাত্মক চার্জ যুক্ত কণিকারা আর পরমাণুর বাইরের দিকে অবস্থান করে ইলেকট্রনগুলো। অনেকটা সৌরজগতের মতো। সৌরজগতে সূর্য থাকে ঠিক কেন্দ্রে। আর গ্রহগুলো নিজদের কক্ষপথে ঘোরে সূর্য কেন্দ্র করে। পরমাণুর ব্যাপারটাও যদি এমন হয় তাহলে ইলেক্ট্রনের জন্য কক্ষপথ থাকতে হবে। ঘুরতে হবে নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে। সমস্যা একটা থেকে যায়, সেটা হলো আকর্ষণ বল। সৌরগজগতে গ্রহগুলো ঘোরে মহাকর্ষ বলের কারসাজিতে।

সৌরজগতে সূর্য আর গ্রহগুলোর মধ্যে কাজ করে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বল। সেই সাথে গ্রহগুলোর ঘূর্ণন গতিশক্তিও কাজ করে। পরমাণুতে মহাকর্ষ বল ক্রিয়া করার সুযোগ নেই। এখানে বরং বৈদ্যুতিক আকর্ষণ বলের ব্যাপার-স্যাপার বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নাগওয়াকা বললেন পরমাণুর ভেতরেও ইলেকট্রনদের এভাবে ঘুরতে বাধা নেই। এখানে ঋণাাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রন আর কেন্দ্রের ধনাত্মক চার্জযুক্ত কণিকাদের মধ্যে বৈদ্যুতিক আকর্ষণ বল কাজ করে। গ্রহদের যেমন নিজস্ব গতিশক্তি আছে। সেই গতিশক্তি গ্রহদের গ্রহগুলোকে সোজাপথে চলাতে চায়। অন্যদিকে মহাকর্ষ বল গ্রহগুলোকে কেন্দ্রের দিকে টেনে নিতে চায়। গতিশক্তিজনিত বল আর মহাকর্ষজনিত বলের টানাটানিতে গ্রহগুলো কোনোদিইে যেতে পারে না। ঘুরপাক খায় সূর্যের চারপাশে, একটা নির্দিষ্ট কক্ষপথে। তেমনি ইলেকট্রনেরও এমন গতিশক্তি আছে। সেই শক্তি ইলেকট্রনকে পরমাণুর ভেতর থেকে বের করে নিতে চাই। অন্যদিকে কেন্দ্র থেকে আসা বৈদ্যুতিক আকর্ষণ বল ইলেকট্রনকে কেন্দ্রের দিকে নিতে চায়। ফলে কোনো দিকেই যেতে পারে না। ইলেকট্রন ঘোরে কেন্দ্রের চারপাশে, একটা নির্দিষ্ট কক্ষপথে।

নাগাওয়াকা পরমাণুর একটা মডেলের কথা বললেন ঠিকই, কিন্তু এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো দিক-নির্দেশনা দিয়ে যেতে পারেননি। তাছাড়া তাঁর তত্ত্ব অনুমাননির্ভর। পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ নয়। তবে সে সময় কিছু উদাহরণ ছিল, যেগুলো পরমাণুর ভেতরের খবর কিছু দিতে পারে। এক্স রশ্মি ও তেজস্ক্রিয়তার ব্যাপারগুলো ততো দিনে আবিষ্কার হয়ে গেছে।

তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে কাজ করার সময় রাদারফোর্ড আলফা কণা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। জেনেছিলেন এর চরিত্র, ধর্ম প্রকৃতি সম্পর্কেও। তিনি আলফা কণার ভর মাপতে সক্ষম হয়েছিলেন। আলফা কণা ধনাত্মক চার্জযুক্ত সেটাও তাঁর জানা ছিল। কিন্তু জানা ছিল না এই আলফা কণা না আসলে কী।

পরমাণু গঠন সম্পর্কে একেকজন একেক ধরনের মতবাদ দিচ্ছেন। মডেল তৈরি করছেন। কিন্তু কোনোটাই ঠিক ত্রুটিমুক্ত নয়। কোনোটাই পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হয়নি। তাই তিনি পরমাণুর ভেতরের খবর পেতে চান।  এর জন্য চাই একজন সংবাদবাহক। মানুষ নয়, কণা। ইলেকট্রন নিতান্তাই হালকা কণা, একে দিয়ে সংবাদবাহকের সে ঠিকঠাক করানো সম্ভব নয়। বিট কণা তো ইলেকট্রনেরই স্রোত। গামা রশ্মির ভর নেই, চার্জও নেই। সে একেবারেই অচল। কিন্তু ভারি শক্তিশালী একটা কণা তো পাওয়া গেছে। আলফা কণা। ওকেই পাঠানো যাক না পরমাণুর ভেতরে। সে তো পরমাণুর ভেতরেই থাকে। এবার গিয়ে না হয় হাঁড়ির খবর নিয়ে আসবে।

এ জন্য করলেন স্বর্ণপাত পরীক্ষা। রাদারফোর্ড তাঁর পরীক্ষায় একটা সোনার পাত ব্যবহার করলেন। পাতটা খুবই পাতলা। ২০টি পরমাণুর ব্যাসের সমান। অর্ধস্বচ্ছ পাত বললেও চলে ওটাকে। স্বর্ণপাতের চারপাশে রাখলেন জিঙ্ক সালফাইড পর্দার একটি বেষ্টনি। এই পর্দা আলোক সংবেদী। পর্দার একদিকে সামান্য একটা গলিপথ রাখা হলে। সেই গলিপথের সামনে রাখা হলো একটা সীসার ব্লক। ব্লকটার ভেতরে রাখা হলো একটা আলফাকণার উৎস। ব্লকে একটা সুড়ঙ্গপথ আছে। সেই পথ দিয়ে ছটন্ত আলফাকণা বেরিয়ে আসে। তারপর আলফাকণার স্রোত (বিম) ঢুকে পড়ে জিঙ্ক সালফাইড পর্দার গলিপথ দিয়ে। এরপর আলফাকণার বিম গিয়ে পড়ে স্বর্ণপাতের ওপর।

আলফা কণা যদি স্বর্ণপাত ভেদ করে চলে যায়, তাহলে সেটা গিয়ে পড়বে জিঙ্ক সালফাইডের বেষ্টনির ওপর। পর্দাটা আলোক সংবেদি। তাই আলফা কণা পর্দার ওপর যেখানে আঘাত করবে সেখানে একটা আলোক বিন্দুর ঝলক দেখা যাবে।

স্বর্ণপাতের ওপর একঝাঁক ছুটন্ত আলফা কণা দিয়ে আঘাত করালেন রাদাফোর্ড। দেখলেন, বেশিরভাগ কণা স্বর্ণপাত ভেদ করে চলে যাচ্ছে। স্বর্ণপাত ভেদ করা সবগুলো আলফা কণা এক পথে যায়নি। কিছু কণা স্বর্ণপাত ভেদ করে একেবারে সোজা গিয়ে পড়েছে জিঙ্ক সালফালইড পর্দার ওপর। কিছু আবার একটু দিক পবির্তন করে অর্থাৎ ভিন্ন পথে ভিন্ন কোণে গিয়ে পর্দার ওপর পড়েছে। অল্প কিছু কণা স্বর্ণপাত ভেদই করতে পারেনি। বিভিন্ন কোণে প্রতিফলিত হয়ে পর্দার ওপর পড়েছে।

ইলেকট্রনের চার্জ ঋণাত্মক আর আলফা কণার চার্জ ধনাত্মক। তাহলে ইলেকট্রন আলফা কণাকে আকর্ষণ করে কী আটকে রাখতে পারত না?

পারত, যদি ইলেকট্রনের ভর আলফা কণার কাছাকাছি হতো। ইলেকট্রন আর আলফা কণার ভরের তফাৎ আকাশ-পাতাল। ইলেকট্রনের সাধ্য নেই প্রবল ভরেবেগে চলা ভারী আলফা কণাকে আকর্ষণ করে আটকে রাখে।

সে না হয় হলো, খটকা তো আরও থেকে যাচ্ছে। সবগুলো আলফাকণাই কেন স্বর্ণপাত ভেদ করে সোজাসুজি গিয়ে পর্দায় আঘাত করল না, তাদের পথ কেনইবা বেঁকে গেল? আবার কিছু কণা প্রতিফলিত হয়ে ফিরেই বা এলো না কেন? নিশ্চয়ই স্বর্ণপাতে এমনকিছু আছে যেগুলো আলফা কণার গতিপথকে প্রভাবিত করেছে। কোনো বস্তুতেই পরমাণুর বাইরে কিছু থাকার কথা নয়। পরমাণু মানেই ইলেকট্রন। সেই ইলেকট্রন যদি আলফা কণার ওপর প্রভাব না ফেলতে পারে, তাহলে কে ফেলল?

এই পরীক্ষা থেকে রাদারফোর্ড নিশ্চিত হলেন, পরমাণু নিরেট নয়। নিরেট হলে আলফা কণা স্বর্ণপাত ভেদ করে চলে যেতে পারত না। ইলেকট্রন কি পারত না আলফা কণাকে বাঁধা দিতে?

রাদারফোর্ড নিশ্চিত হন, সকল পরমাণুতেই একটা ঘন জমাট বস্তু আছে। সেই বস্তুটা বেশ ভারি, এবং আলফা কণার গতিপথের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেটা ঋণাত্মক চার্জের হলে হবে না। সেটার চার্জ ধনাত্মক। আর ধনাত্মক বলেই বলেই সেটা আফলা কণাকে বিকর্ষণ করে। তাই কোল ঘেষে যাওয়া আলফা কণার গতিপথ বেঁকে যায়।

বেঁকেই বা যায় কেন? সেই ভারি বস্তুটা যদি ধনাত্মক এবং সেটা নিরেট বস্তু হয়, তাহলে আলফা কণা তাতে বাধা পেয়ে ফিরে আসার কথা। পাত ভেদ করে গেল কীভাবে? তাহলে কি পরমাণুর ভেতররে শুধু ধনাত্মক ভারি বস্তুটি আর ইলেকট্রন ছাড়াও ফাঁকা জায়গা আছে?

রাদারফোর্ড সেটাই নিশ্চিত হলেন। বললেন, পরমাণুর গঠন কিছুটা সৌরজগতের মতো। এর কেন্দ্রে রয়েছে অত্যন্ত ঘন ও ধনাত্মক চার্জযুক্ত নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসের বাইরে রয়েছে বিরাট ফাঁকা অঞ্চল। কতটা ফাঁকা, সেটা বোঝাতে দারুণ এক উদহারণ দিলেন রাদারফোর্ড। তিনি বললেন, পরামাণু হলো বিশাল এক মন্দিরের মতো। তাঁর ভেতরে যদি একটা মাছি থাকে তাহলে সেটাই হলো পরমাণুর নিউক্লিয়াস। তারমাণে পরমাণুর ভেতর বেশিরভাগ জায়গায়ই ফাঁকা।

রাদারফোর্ড হিসাব করে দেখালেন, নিউক্লিয়াসের আয়তন পরমাণুর মোট আয়তনের ১০ লক্ষ ভাগের একভাগ। রাদার্ফোড পরমাণু আর নিউক্লিয়াসের ব্যসার্ধ্য নির্ণয় করতেও সক্ষম হলেন। পরমাণুর ব্যাস পেলেন ১০-১০ মিটার আর নিউক্লিয়াসের ব্যাস ১০-১০ মিটার। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, আয়তনে যত নগণ্যই হোক পরমাণুর প্রায় সবটুকু ভর দখল করে থাকে নিউক্লিয়াস। ইলেকট্রনের ভর এত নগণ্য, পরমাণুর মোট ভরের তুলনায় সেটা কিছুই নয়।

রাদারফোর্ড আরো বললেন, নেগেটিভ চার্জ যুক্ত ইলেক্ট্রন পজেটিভ চার্যযুক্ত নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা ইলেক্ট্রনের গতি-প্রকৃতি অনেকটা আমাদের সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহগুলোর মতো। তাই রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলকে সোলার সিস্টেম অ্যাটম মডেলও বলে। পার্থক্য হলো, সূর্য ও তার গ্রহগুলোর মধ্যে মহকর্ষ বল ক্রিয়া করে আর নিউক্লিয়াস আর ইলেক্ট্রনগুলোর মধ্যে ক্রিয়া করে বিদ্যুৎচ্চুম্বকীয় বল।

১৯১১ সালে আর্নেস্ট রাদারফোর্ড একটা পরীক্ষা করলেন। সে বছর ৭ই মার্চ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেন। 

রাদারফোর্ডের পরমাণু মডের প্রশংসিত হতে লাগল বিজ্ঞানীমহলে। এই মডেল থেকে পরমাণুর ব্যাখ্যা পাওয়া গেল বিদ্যুৎ নিরপেক্ষতার বিষয়ে। পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে ধনাত্মক চার্জযুক্ত নিউক্লিয়াস। তাকে কেন্দ্র করে ঘোরে ঋণাত্মক চার্জযুক্ত  ইলেকট্রন। ধণাত্মক আর ঋণাত্মক চার্জ পরস্পরের প্রভাব কাটাকাটি করে দেয়। এজন্যই পরমাণু চার্জ নিরপেক্ষ।

কিন্তু বেশিদিন প্রসংশার বৃষ্টিতে ভিজতে পারল না রাদাফোর্ডের পরমাণু মডেল। বেশ কিছু ত্রুটি বেরিয়ে এলো এই মডেল থেকে। ম্যাক্সওয়েলের বিদ্যুৎম্বকীয় সমীকরণ করল ঝামেলা। ম্যাক্সওয়েল বলেছিলেন, কোনো চার্জযুক্ত কণা সুষম বেগে চললে তখন কোনো বিদ্যুৎম্বকীয় তরঙ্গ বিকিরণ করে না। কিন্তু যদি সেই কণা ত্বরিত হয় কিংবা প্রতি মুহূর্তে দিক বদলায়, তখন তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ বিকিরণ করে। বিদ্যুৎচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ বিকিরণ করার ফলে কিছুটা শক্তি হারায় চার্জিত কণা।

রাদারফোর্ডের মডেলে ইলেকট্রনের ঘুর্ণনের কথা বলা হয়েছে। ইলেকট্রন ঋণাত্মক চার্জে চার্জিত কণা। আর সে ঘুরছে নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে। আমরা জানি, বেগ ভেক্টর রাশি। প্রতি মুহূর্তে বেগের পরিবর্তন ঘটার হারকে ত্বরণ বা মন্দন বলে। ভেক্টর রাশির দিক পরিবর্তন মানে এর মানেরও পরিবর্তন। ঘূর্ণনশীল কণা প্রতি মূহূর্তে দিক বদলায়। তার মানে এর বেগের দিকের পরিবর্তন ঘটে। ফলে বেগের মানেরও পরিবর্তন ঘটে। সুর্তরাং ঘুর্ণন গতি মানেই ত্বরিত গতি।

ইলেকট্রন প্রতি মুহূর্তে নিজের কক্ষপথে নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। তার মানে, ইলেকট্রনের এই ঘুর্ণন গতি আসলে ত্বরিত গতি। আর ত্বরিত ইলেকট্রন নিশ্চয়ই বিদ্যুৎম্বকীয় শক্তি বিকিরণ করে। বিকিরণের জন্য সেই শক্তি ইলেকট্রন পাবে কোথায়? নিশ্চয়ই তার গতিশক্তি থেকে ধার করবে। এর ফলে প্রতিমুহূর্তে কমবে ইলেকট্রনের গতিশক্তি। গতিশক্তি কমার ফলে ক্রমেই কমবে কেন্দ্র থেকে দূরত্ব।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। একটা রিংয়ের সাথে একটা সুতো বাঁধুন। সুতোর অন্যমাথা বেঁধে ফেলুন একটা পাথর। রিংটার ভেতর গলিয়ে দিন আপনার হাতের তর্জনি নামের আঙুলটা। রিংটা কিন্তু ঢিলেঢালা হওয়া লাগবে। এবার রিংসহ আঙুলটা ঘোরান। দেখবেন, সুতোটা আর ঢিলা হয়ে ঝুলে নেই। সেটা তখন সোজা হয়ে শূন্যে ঘুরবে, পাথরের টুকরোটা সাথে নিয়ে। মাটির সাথে সমান্তরালে। ঘুর্ণনের গতির জোর বেশি হলে পাথরের টুকরোটা আপনার আঙুলের সবচেয়ে দূরে অবস্থান করবে। সুতো আর পাথর ঘুরবে আপনার আঙুলকে কেন্দ্র করে। মনে হবে পাথর যেন একটা নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরছে।

এর কারণ পাথরের ঘূর্ণন গতিশক্তি মহাকর্ষ বলকে উপেক্ষা করতে পারছে। এবার আঙুলটার ঘুর্ণনের বেগ ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলুন। দেখবেন বেগ কমার সাথে সুতোও ঢিল হয়ে আসছে। পাথরটা কিছুটা হেলে পড়ছে মাটির দিকে। এক সময় আঙুলটার ঘোরা বন্ধ করে দিন। তখন সুতটা হেলে পড়বে আপনার আঙুলের গায়ে। পাথরের টুকরোটাও থাক্কা খাবে আপনার আঙুলে সাথে। তারপর থেমে যাবে।

এখানে পাথরটার ঘূর্ণন গতি ওটাকে শূন্যে একটা নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরতে বাধ্য করছিল। ধীরে ধীরে যতই তার গতিশক্তি কমতে শুরু করল, পাথরটা আঙুলের দিকে হেলতে শুরু করল তত। গতিশক্তি থেমে গেল যখন, পাথরটা তখন হুমড়ি খেয়ে পড়ল আঙুলের গায়ে।

নিউক্লিয়াস আর ইলেকট্রনের ক্ষেত্রেও এমন কিছু ভাবা যেতে পারে। তবে এখানে সুতোর বদলে কাজ করবে বৈদ্যুতিক আকর্ষণ শক্তি। সেই শক্তি আর আর ইলেকট্রনের গতিশক্তি পরস্পরকে কাটাকাটি করে দেয়। তাই ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘূরতে থাকে। বৈদ্যুতিক আকর্ষণ শক্তির চেয়ে যদি ইলেকট্রনের গতিশক্তি বেশি হত, তাহলে ইলেকট্রন আর কক্ষপথে আটকে থাকতে পারত না। ছিটকে বেরিয়ে যেত পরমাণু থেকে।

গতিশক্তি অনবরত কমতে থাকলেইবা সে নিজের কক্ষপথে ঘুরবে কেন?

তখন বৈদ্যুতিক আকর্ষণ শক্তি তার ওপর প্রভাব ফেলবে এবং ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের দিকে কিছুটা এগিয়ে যাবে। অর্থাৎ কমে যাবে ইলেকট্রনের কক্ষপথের ব্যস্যার্ধ।

আগেই বলা হয়েছে ঘুর্ণনের কারণে ইলেকট্রন তড়িচ্চুস্বকীয়র তরঙ্গ বিকিরণ করে। এর ফলে কমে যায় তার গতিশক্তি। ধীরে গতিশক্তি কমছে, তাই ব্যাসার্ধ কমছে কক্ষপথের। এভাবে গতিশক্তি কমতে থাকলে একসময় ইলেকট্রন সর্পিল গতিতে গিয়ে নিউক্লিয়াসের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়বে। এটা রীতিমতো অঙ্ক কষে বের করা যায়। তাই যদি হয়, তাহলে তো যেমন পরমাণুর কথা বলছেন রাদাফোর্ড, পরমাণু আসলে তেমন নয়। নিউক্লিয়াস আর পরমাণু মিলে-মিশে ঘন জমাট একটা কণা তৈরি করার কথা। কিন্তু আলফাকণার পরীক্ষা তো তা বলছে না। পরমাণুর বিশাল অঞ্চলই ফাঁকা, এটাই বলছেন রাদারফোর্ড তাঁর পরমাণু মডেলে।

রাদারফোর্ডের মডেলের ত্রুটি সারার কাজে হাত দেন তাঁরই ছাত্র ডেনিস বিজ্ঞানী নীলস বোর। এজন্য তিনি ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক আর আইনস্টাইনের প্রতিষ্ঠা করা কোয়ান্টাম তত্ত্বের দিকে হাত বাড়ালেন। তিনি ইলেকট্রনদের জন্য একটা নির্দিষ্ট শক্তিস্তর বেঁধে দিলেন। যেগুলোকে আমরা কক্ষপথও বলতে পারি। বোরের মতে শক্তিস্তরের সংখ্যা অসীম নয়। নিউক্লিয়াসের চারপাশে নির্দিষ্ট শক্তির কিছু কক্ষপথ থাকবে। কাছের শক্তিস্তরটির সঙ্গেও নির্দিষ্ট আর সর্বনিম্ন দূরত্ব থাকবে। এই দূরত্বের চেয়ে বেশি কাছে আর কোনো কক্ষপথ থাকতে পারবে না। কক্ষপথগুলোতে ঘোরার সময় ইলেকট্রন বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গ বিকিরণ করতে পারে। সেই বিকিরণের ফলে সে নিচের শক্তিস্তরেও নামতে পারবে। কিন্তু সর্বনিম্ন শক্তির কক্ষপথ, যেটা নিউক্লিয়াসের সবচেয়ে কাছে, সেটাতে ঘোরার সময় বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গ বিকিরণ করে নিউক্লিয়াসের আরও কাছে যেতে পারবে না। সূতরাং ইলেকট্রনের নিউক্লিয়াসের ভেতরে পড়ে যাবার আও কোনো আশঙ্কাই থাকে না।

বোরের পরমাণু মডেলেরও ত্রুটি ছিল। জার্মান পদার্থবিদ উইলিয়াম সোমারফেল্ড সেটার সমাধান দেন। পরে পাউলি উলফগ্যাং পাউলিও কোয়ান্টামভিত্তিক পরমাণু মডেল প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখেন। তবে এতকিছুর পরেও নিউক্লিয়াস নিয়ে তেমন ঝামেলা হয়নি পরমাণু মডেলে। যখন ঝামেলা শুরু হলো, তখন বদলে গেলা নিউক্লীয় পদার্থবিদ্যার ইতিহাস।

দৈনিক বগুড়া
দৈনিক বগুড়া
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর