সংগৃহীত
দর্শকপ্রিয় সিরিজ ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এ তার অভিনয় আর সংলাপের জাদুতে তিনি সবার প্রিয় ‘কাবিলা’। নোয়াখালীর ভাষায় কথা বলা সেই ছটফটে এই যুবককে দর্শক মনে রেখেছে নিজের ঘরের মানুষের মতো করে। কিন্তু অভিনয়ের পর্দার বাইরে অভিনেতা জিয়াউল হক পলাশের আছে অন্য এক পরিচয়।
সম্প্রতি রুম্মান রশিদের পডকাস্টে অংশ নিয়ে তিনি মেলে ধরেছেন নিজের জীবনের এমন এক মানবিক রূপ, যা তাকে পর্দার নায়কের চেয়েও বড় এক বাস্তব জীবনের নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নিজের মানবিক সংগঠন ‘ডাকবাক্স ফাউন্ডেশন’ নিয়ে তিনি নীরবে লড়ে যাচ্ছেন, একটুখানি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায়।
পলাশ মনে করেন, শুধু সাময়িক সাহায্য নয় বরং টেকসই কোনো উপায়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত সেবা। মানুষের প্রতি তার এই অকৃত্রিম টান এবং সেবার পেছনের দর্শন ফুটে ওঠে তার বক্তব্যে। বলেন, ফাউন্ডেশন যেভাবে আমরা ফাউন্ডেশন মনে করি, আজকে আপনার কাছ থেকে আমি ১০ টাকা নিয়ে বন্যার্তদের দান করব, এটা হয়তোবা ফাউন্ডেশনের একটা প্রসেসের মধ্যে মানুষ হয়তোবা মনে করে অনেকে। বাট আমি এটা মনে করি না। ফাউন্ডেশন মিনস হচ্ছে ফাউন্ডেশন। আপনি মানুষকে জামাকাপড় দিয়ে, খাবার দিয়ে, টাকা দিয়ে আপনি কখনো মানুষের উপকার করতে পারবেন না। আপনার মানুষকে কর্মসংস্থান তৈরি করে দিতে হবে, কাজের যোগান করে দিতে হবে।
মানুষের প্রতি এই দায়বদ্ধতা পলাশের জীবনে হঠাৎ করে আসেনি। শিকড়েই লুকিয়ে ছিল তার শৈশব আর অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতাবোধে। করোনাকালে যখন পুরো পৃথিবী থমকে গিয়েছিল, তখন পলাশ পাশে দাঁড়িয়েছেন সেই সব মানুষের যারা একসময় তার পরিবারের পাশে ছিলেন।
তার এই মানবিক কার্যক্রম শুধু করোনাকালে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ছড়িয়ে পড়েছে বন্যার মতো সংকটেও। রোজার মধ্যে ইফতারের বিশেষ আয়োজন করেছেন এই অভিনেতা। মানুষকে ভালো কিছু খাওয়ানোর আশায় নিজেরা রান্না করেছেন। পডকাস্টে অভিনেতা বলেন, ইফতারির সময় আমরা কিন্তু এই যে ছোলা-পেঁয়াজু প্যাকেট করে ইফতার দেওয়ার প্রসেসে আমরা করি নাই। আমরা নিজেরা রান্না করছি। একদম রাতভর রিয়াজ-শাকিল ওরা কেনাকাটা করছে। রিয়াজ সারারাত বাজার করে। শুভ, রাজ, হাসান, রাসেল সবাই মিলে শাকিল সবাই মিলে রান্নাবান্না চলতেছে। গরম গরম প্যাকেট করতেছি, মাদ্রাসায় দিয়ে আসতেছি।
পলাশের মানবিকতার এক অনন্য এবং প্রশংসনীয় নজির হচ্ছে মা ও শিশুদের জন্য তৈরি করা ব্রেস্টফিডিং সাপোর্ট সেন্টার ‘যতন’। ব্যক্তিগত জীবনের এক স্পর্শকাতর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি অনুধাবন করেছেন দেশের পাবলিক প্লেসগুলোতে মায়েদের চরম ভোগান্তির কথা। স্কটল্যান্ডে ঘুরতে গিয়ে পার্কের ভেতরে আধুনিক বুথ দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন দেশের মায়েদের জন্য এমন কিছু করার জন্য। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সহায়তায় তিনি এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করছেন যা দেশের সাধারণ মায়েদের জন্য আক্ষরিক অর্থেই এক আস্থার জায়গা হতে যাচ্ছে।
এই উদ্যোগের পেছনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, আমার ছেলে যখন এক বছর হয়েছে তখন আমরা ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম লন্ডনে। স্কটল্যান্ডের পার্কের মধ্যে তখন আমার ছেলে ব্রেস্টফিডিং করবে, তো আমরা সুন্দর একটা বুথ পেয়ে গেছি, করে ফেলছি। এই সেম ক্যারেক্টারগুলো আমরা দেশে যখন আমরা ঢাকার বাইরে যাব, টার্মিনালের মধ্যে আমি কিন্তু এই সুযোগটা পাইনি। একদম না। তখন আমি একটা মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ, খালিদ ভাই। পরে আমরা একসাথে পুরা জিনিসটা সাজাইছি। তখন আমি বললাম যে, এরকম এরকম।
পলাশ বলেন, সাজানোর পরে আমি কানাডাতে একটা শো করতে গিয়েছিলাম, তখন চট্টগ্রামের মেয়র মহোদয়ের সাথে আমার ওইখানে পরিচয় হয়েছে। তার আগ পর্যন্ত আমি কিন্তু তাকে চিনতাম না। সেও ওইখানে প্রোগ্রামটা দেখতে গিয়েছিল। তো তার সাথে চা খাইতে খাইতে আমি বলতেছিলাম, 'আমার না এরকম একটা প্ল্যান আছে, যদি আপনারা একটু সাপোর্ট টাপোর্ট দেন তাইলে কিন্তু করা যায়। কারণ সিটি কর্পোরেশনের আন্ডারে তো অনেক জায়গা থাকে।' তখন বলছে, 'ভাইয়া আপনি কি করতে চান বলেন?' তখন আমি বললাম যে, 'এরকম এরকম।' পরে উনি বলতেছে যে, 'খুবই সম্মানিত একটা কাজ, কাজটা করবো।' তারপর আমি চিটাগাং গেলাম। যাওয়ার পরে প্রসেসিং হলো, হওয়ার পরে তারা আমাদের ল্যান্ড দিল।

উল্লেখ্য, পর্দার কাবিলা হয়তো দর্শকদের হাসায়, কিংবা তার সংলাপগুলো দিয়ে বিনোদিত করে। কিন্তু পর্দার পেছনের এই পলাশ একজন লড়াকু যোদ্ধা, যিনি মানুষের নীরব কষ্টগুলো শোনেন আর সেটা বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এসব কার্যক্রমের জন্য জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পুরস্কারও পেয়েছেন। কিন্তু নিজের প্রচারণা চালাননি; নীরবে কাজ করে প্রমাণ করেছেন নিজেকে সত্যিকারের নায়ক হিসেবে।
ডিএ
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট


.webp)

















.webp)