সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি আর আমদানিতে নানা জটিলতার জেরে দেশে এলপি গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা কাটছেই না। সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে সিলিন্ডারপ্রতি কয়েকশ টাকা অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। আমদানিকারকরা বলছেন, বিইআরসির নির্ধারিত মূল্যে ভর্তুকির চাপে ডিলার পর্যায়ে কমিশন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এদিকে, ভ্যাট প্রত্যাহার আর ‘রমজানে স্বাভাবিক হবে’ এমন আশ্বাসের পরেও এ খাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
এলপি গ্যাসের সংকট কাটাতে অংশীজনদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করে বেশ কিছু সমাধানের পথ নির্ধারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে তখন দাবি করা হয়েছিল, দেশে এলপি গ্যাসের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। অসাধু ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকটের কারণে দাম বেড়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আশ্বাস দিয়েছিল, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হওয়া এই অস্থিরতা রমজানের মধ্যে কেটে যাাবে।
তবে রমজান শুরু হলেও বাজারের চিত্র এখনো আগের মতো। সিলিন্ডারের মজুত ও সরবরাহ বাড়লেও দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সরকার-নির্ধারিত ১৩৪১ টাকার সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৮০০ বা ২ হাজার টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি এবং বিইআরসির মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ার অসামঞ্জস্যতার কারণে কোম্পানিগুলোর ওপর অতিরিক্ত ভর্তুকির চাপ পড়ছে। এর ফলে ডিস্ট্রিবিউশন পর্যায়ে নির্ধারিত কমিশন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে এবং ভোক্তাদের ওপর।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি এলপিজির দাম ১৫ টাকা কমিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বিইআরসি। ফলে ১৩৫৬ টাকার সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১৩৪১ টাকায়। সরকারের এই উদ্যোগের পরেও সাধারণ গ্রাহকদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে
বাড়তি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার
রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার বাসিন্দা মো. জুবায়ের চলতি মাসে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছেন ১৮০০ টাকা দিয়ে। তিনি বলেন, যে বাসায় থাকি সেখানে পাইপলাইনের গ্যাস নেই। সিলিন্ডার গ্যাসই একমাত্র ভরসা। অথচ সেই সিলিন্ডারও বাড়তি দাম দিয়ে কিনতে হলো। আফসোসের বিষয় হলো, সরকার নির্ধারিত দামে কখনোই গ্যাস কিনতে পারলাম না।
বাজারে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সরবরাহ করছে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। চাহিদা অনুযায়ী আমদানি না হওয়ায় সংকট পুরোপুরি কাটছে না বিক্রেতা ও ডিলার
মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, সরকার কিছুদিন আগে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম কমালো, অথচ বাজারের পরিস্থিতি উল্টো। ১৩০০ টাকার সিলিন্ডার কিনতে হলো ১৭০০ টাকায়। এই পরিস্থিতির অবসান কবে হবে?
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাজার স্থিতিশীল রাখা ও ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে এলপিজির ওপর সামগ্রিক ভ্যাট কমায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। স্থানীয় উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ের ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট এবং আমদানি পর্যায়ের ২ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হয়।
এনবিআর জানিয়েছিল, এই এসআরও কার্যকর হওয়ার পর ভোক্তাদের ওপর ভ্যাটের চাপ প্রায় ২০ শতাংশ কমবে।
এর পরই গত ২৪ ফেব্রুয়ারি এলপিজির দাম ১৫ টাকা কমিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বিইআরসি। ফলে ১৩৫৬ টাকার সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১৩৪১ টাকায়। সরকারের এই উদ্যোগের পরেও সাধারণ গ্রাহকদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে।
বাজারে এখনো সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। অল্প কয়েকটা কোম্পানি গ্যাস দিচ্ছে, তবে দাম বাড়তি রাখছেবিক্রেতা রুবেল আহমেদ
বিক্রেতা ও ডিলাররা বলছেন, বাজারে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সরবরাহ করছে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। চাহিদা অনুযায়ী আমদানি না হওয়ায় সংকট পুরোপুরি কাটছে না।
মোহাম্মদপুরের সিলিন্ডার বিক্রেতা ‘বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স’-এর মালিক রুবেল আহমেদ বলেন, বাজারে এখনো সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। অল্প কয়েকটা কোম্পানি গ্যাস দিচ্ছে, তবে দাম বাড়তি রাখছে।
দেশে প্রতি মাসে এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন আমদানি হয়েছে এবং এরপরেও আরও কিছু শিপমেন্ট হওয়ার কথা। এতে ঘাটতি অনেকটাই কমে আসবে। বাংলাদেশের কোনো জাহাজ নিষেধাজ্ঞা পায়নি, পেয়েছে কিছু আন্তর্জাতিক জাহাজ। বিকল্প হিসেবে আমরা আর্জেন্টিনা ও অন্যান্য দেশ থেকে এলপিজি আমদানি করছি। আশা করছি ঈদের আগেই সরবরাহ স্বাভাবিক হবেএলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশিদ
বনশ্রীর এলপিজি ডিলার ও বিক্রেতা ইউসুফ আলী বলেন, বর্তমানে ওমেরা, সানগ্যাস ও টি.কে কোম্পানি সিলিন্ডার সাপ্লাই দিচ্ছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় কম। ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্ট থেকে গ্যাস পাওয়া গেলেও সরকারি দামে পাওয়া যাচ্ছে না। ১৩০০ টাকার সিলিন্ডার আমাদের কিনতে হচ্ছে ১৫০০ টাকায়, যা ১৬০০-১৭০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
এলপিজি খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন গত বছরের নভেম্বর মাসে দেশে এলপিজি আমদানির পরিমাণ প্রায় ৪৪ শতাংশ কমে যায়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসেও পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয়নি। তবে চলতি মাসে আমদানি কিছুটা বেড়েছে।
এলপিজির এই সংকট কেউ আগে বুঝতে পারেনি। এখন এ খাতে সরকারের যথাযথ মনিটরিং ও পরিকল্পনা দরকার। এই পণ্যটিকে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পুরো খাতটি শুধু বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। বিপিসিকে (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) এগিয়ে আসতে হবে এবং অন্তত ৩০-৪০ শতাংশ আমদানি তাদের করা উচিতজ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশিদ বলেন, দেশে প্রতি মাসে এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন আমদানি হয়েছে এবং এরপরেও আরও কিছু শিপমেন্ট হওয়ার কথা। এতে ঘাটতি অনেকটাই কমে আসবে।
বিভিন্ন কারণে এলপিজি আমদানির পরিমাণ কমে গিয়েছিল, যা বর্তমানে বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। অপারেটর ও কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বেশ কিছু সমস্যা উঠে এসেছে; যার মধ্যে আন্তর্জাতিক জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা অন্যতম। এ ছাড়া আরেকটি বড় বিষয় হলো জাহাজের ভাড়া (ফ্রেট), যা প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণের সময় সমন্বয় করা হয়। গত মাসে এই ভাড়া ১২০ ডলার থাকলেও বর্তমানে তা বাড়তির দিকে আছে, যা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছিবাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য (গ্যাস) মিজানুর রহমান
যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো জাহাজ নিষেধাজ্ঞা পায়নি, পেয়েছে কিছু আন্তর্জাতিক জাহাজ। বিকল্প হিসেবে আমরা আর্জেন্টিনা ও অন্যান্য দেশ থেকে এলপিজি আমদানি করছি। আশা করছি ঈদের আগেই সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।
অতিরিক্ত মূল্যের বিষয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির প্রিমিয়াম (আমদানি ভাড়া খরচ) ১৬০ ডলার হলেও বিইআরসি তা ১২০ ডলারে হিসাব করে। ফলে এই ৪০ ডলারের ভর্তুকি কোম্পানিকে দিতে হয়। এই চাপের কারণে ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটরদের আগের মতো কমিশন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিইআরসির উচিত মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে এলপিজির দাম ১৫০০ টাকা নির্ধারণ করা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন বলেন, এলপিজির এই সংকট কেউ আগে বুঝতে পারেনি। এখন এ খাতে সরকারের যথাযথ মনিটরিং ও পরিকল্পনা দরকার। এই পণ্যটিকে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পুরো খাতটি শুধু বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। বিপিসিকে (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) এগিয়ে আসতে হবে এবং অন্তত ৩০-৪০ শতাংশ আমদানি তাদের করা উচিত।
তিনি জানান, এলএনজির তুলনায় এলপিজি স্টোরেজ করা সহজ ও সাশ্রয়ী, তাই স্টোরেজ ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (গ্যাস) মিজানুর রহমান বলেন, বিভিন্ন কারণে এলপিজি আমদানির পরিমাণ কমে গিয়েছিল, যা বর্তমানে বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। অপারেটর ও কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বেশ কিছু সমস্যা উঠে এসেছে; যার মধ্যে আন্তর্জাতিক জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা অন্যতম। এ ছাড়া আরেকটি বড় বিষয় হলো জাহাজের ভাড়া (ফ্রেট), যা প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণের সময় সমন্বয় করা হয়। গত মাসে এই ভাড়া ১২০ ডলার থাকলেও বর্তমানে তা বাড়তির দিকে আছে, যা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি।
তিনি বলেন, এলপিজি সংকট মোকাবিলায় নতুন সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ সব পক্ষ আন্তরিকভাবে কাজ করছে। আমরা আশাবাদী, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খুব দ্রুতই এই সংকট কেটে যাবে।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

















.jpg)