বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২

ঈদে ঘুরে দেখুন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দর্শনীয় স্থান

ঈদে ঘুরে দেখুন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দর্শনীয় স্থান

সংগৃহীত

শিল্প ও সংস্কৃতির রাজধানী খ্যাত ঐতিহ্যবাহী তিতাস বিধৌত, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, কবি আল মাহমুদ, কবি আবদুল কাদির, কথা সাহিত্যিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ বহু জ্ঞানী গুণীর জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ৯টি উপজেলা নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১৯৮৪ সালে জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তে। এই জেলার পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পশ্চিমে নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জ জেলা, উত্তরে সিলেটের হবিগঞ্জ এবং দক্ষিণে কুমিল্লা জেলা অবস্থিত। তিতাস আর মেঘনা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

আসন্ন ঈদুল ফিতরের ছুটিতে পরিবার পরিজন সময় কাটাতে ভ্রমণ প্রিয়জনেরা যাবেন শহর ও গ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে। দর্শনার্থীদের জন্য যা আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়-

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শহীদ স্মৃতিসৌধ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে পাকবাহিনীর বিকল উভচর একটি ট্যাংক মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক হিসেবে শহরের ফারুকী পার্কে সযত্নে স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে সামরিক শাসনামলে ট্যাংকটি কুমিল্লা সেনানিবাসে স্থানান্তর করা হয়। এর বিরুদ্ধে এলাকার শান্তিকামী মানুষের তীব্র প্রতিবাদ সামরিক শাসকদের বাধ্য করে উক্ত স্থানে তিন স্তম্ভ বিশিষ্ট একটি মনোরম স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করতে ১৯৮৪ সালের ১৯ মে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ১৯৮৫ সালের ২৯ এপ্রিল এটা উদ্বোধন করা হয়। স্মৃতিসৌধটি সার্বক্ষণিক খোলা থাকে।

কিভাবে যাবেন : শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থান হওয়ায় রিকশা ও অটো দিয়ে সহজেই যাওয়া যায়।

বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের সমাধি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোস্তফা কামাল। আখাউড়া উপজেলা মোগড়া ইউনিয়নের গঙ্গাসাগর প্রতিরক্ষা অবস্থানের দরুইন গ্রামে নিয়োজিত আলফা কোম্পানির ২নং পাটুনের একজন সেকশন কমান্ডার ছিলেন মোস্তফা কামাল। সেই স্থানে ১৭ ই এপ্রিল পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে সহযোদ্ধাদের পেছনে হটার নির্দেশ দিয়ে তিনি কাভারিং ফায়ার করতে থাকেন। মারাত্মক জখম অবস্থায় তার এলএমজির গুলি শেষ হয়ে যায়। পাকিস্তানি সৈন্যরা এসে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাকে হত্যা করে। দরুইন গ্রামের জনগণ মোস্তফা কামালকে তার শাহাদত স্থানের পাশেই সমাহিত করেন। সমাধি স্থলটি সবসময় দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে।

কিভাবে যাবেন : এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। ট্রেন, সিএনজিচালিত অটোরিকশা করেও যাওয়া যাবে তবে সময় লাগবে ৫০ মিনিট। সমাধিস্থলে প্রবেশে কোনো ধরণের টিকেট লাগবে না।

হরিপুর জমিদার বাড়ি

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামে তিতাস নদীর পূর্ব তীরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী হরিপুর রাজবাড়ি। ১৮৪৩ সাল থেকে ১৮৫০ সাল এর মধ্যে জমিদার গৌরীপ্রসাদ রায় চৌধুরী ও কৃষ্ণপ্রসাদ রায় চৌধুরী বাড়িটি নির্মাণ করেন। প্রায় ৪৮০ শতাংশ জমির উপর প্রতিষ্ঠিত তিনতলা জমিদার বাড়িটিতে প্রায় ৬০টি কক্ষ, রং মহল, দরবার হল, ধানের গোলা, গোয়াল ঘর, রান্নাঘর, নাচ ঘর, খেলার মাঠ, মন্দির রয়েছে। বিশাল আয়তনের বাড়িটির পুরো ভবনের কোথাও কোনো রডের গাঁথুনি নেই। এই বাড়িতে মধুমালতি, ঘেটুপুত্র কমলা, নাইওরীসহ অনেক চলচ্চিত্র চিত্রায়িত হয়েছে। জমিদার বাড়িটি সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে।

কিভাবে যাবেন : ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরত্ব। এখানে বাস অথবা অটোরিকশা করেও যাওয়া যাবে। সময় লাগবে ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। জমিদার বাড়িতে প্রবেশে কোনো ধরনের টিকেট লাগবে না।

সরাইলের ঐতিহাসিক আরিফাইল মসজিদ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলায় রয়েছে মোঘল আমলে নির্মিত অর্পূব স্থাপত্য-শিল্প ঐতিহাসিক আরিফাইল মসজিদ। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে দরবেশ শাহ আরিফ ১৬৬২ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেন এবং তার নামানুসারে এই মসজিদের নাম করণ করা হয়। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট আরিফাইল মসজিদের উচ্চতা ৭০ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং দেওয়াল গুলো ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি পুরু। চারকোণে আছে চারটি অষ্টকোণাকৃতি মিনার।

কিভাবে যাবেন : ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে এটির ৩০ কিলোমিটার দূরত্ব। বাস অথবা সিএনজিচালিত অটোরিকশা করে গেলেও সময় লাগবে ৪০ মিনিট। জমিদার বাড়িতে প্রবেশে কোনো ধরণের টিকেট লাগবে না।

কেল্লা শহীদ মাজার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার খড়মপুরে অবস্থিত হজরত সৈয়দ আহাম্মদ গেছু দারাজ (র.) এর দরগাহ যা কেল্লা শহীদের দরগাহ নামে সমগ্র দেশে পরিচিত। প্রতি বছর ওরসে কেল্লা শহীদের মাজারে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। এ সমাধিক্ষেত্রটি প্রায় এগারশ বৎসর পূর্বে স্থাপিত হয়েছে।

কিভাবে যাবেন : ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরত্ব, ট্রেন লোকাল বাস অথবা সিএনজিচালিত অটোরিকশা করেও যাওয়া যাবে। সময় লাগবে ৫০ মিনিট।

তিতাস নদী

স্থানীয় উপকথা অনুসারে তিতাস নদীকে মেঘনার কন্যা বা মেয়ে বলা হয়ে থাকে। তিতাস নদী ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলার কাছাকাছি প্রবাহিত হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে ভৈরব-আশুগঞ্জের সীমানা ঘেঁষে মেঘনা নদীর সাথে একীভূত হয়েছে। তিতাসের গড় গভীরতা ৯৮ কিলোমিটার।

কিভাবে যাবেন : ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে ১ কিলোমিটার দূরত্ব, পায়ে হেঁটে অথবা রিকশা করেও যাওয়া যাবে। সময় লাগবে ৫ মিনিট।

আখাউড়া স্থলবন্দর

ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় সহ সাতটি রাজ্যে প্রবেশের অন্যতম দ্বার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্থলবন্দর। ১৯৯৪ সালে চালু হয় এই মূল বন্দরটি। এক সময় প্রতিদিন বিকাল ৫টায় ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী মনোমুগ্ধকর এক আয়জনের মাধ্যমে দুই দেশের পতাকা নমিত করা হতো। করোনা মহামারির পর থেকে বিশেষ দিন ও জাতীয় দিবসে এই আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হয়। যা দেখার জন্য বিভিন্নস্থান থেকে দুই দেশের পর্যটকদের আগমন ঘটে।

কিভাবে যাবেন : ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরত্ব, ট্রেন লোকাল বাস অথবা সিএনজিচালিত অটোরিকশা করেও যাওয়া যাবে। সময় লাগবে ৫০ মিনিট। দুই দেশের পতাকা নমিত আয়োজনটি উপভোগ করতে হলে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্ব সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

কাল ভৈরব মন্দির

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হিন্দু সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী কালভৈরব মন্দিরটির অবস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের অদূরে মেড্ডা এলাকায়। প্রায় ২০০ বছর পূর্বে দূর্গাচরণ আচার্য স্বপ্নদৃষ্ট হয়ে বিগ্রহটি নির্মাণ করেছিলেন। সুবিশাল মূর্তিটির উচ্চতা ২৮ ফুট।

কিভাবে যাবেন : ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে ১.৫ কিলোমিটার দূরত্ব, পায়ে হেঁটে অথবা রিকশা করেও যাওয়া যাবে। সময় লাগবে ৭ মিনিট।

সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন

যে কৃর্তি পুরুষের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া সমগ্র ভারত উপমহাদেশ এবং বিশ্বব্যাপী পরিচিতির সৌভাগ্য অর্জন করেছে তিনি হলেন তিতাস পাড়ের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। বিশ্ব বরেণ্য সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্ম ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে নবীনগরের শিবপুর গ্রামে। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের পরে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ মাইহারের রাজদরবারে সঙ্গীত গুরুর আসন লাভ করেন। এসময়ে তিনি ইংল্যান্ডের রাণী কর্তৃক সুর সম্রাট খেতাব প্রাপ্ত হন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ১৯৫২ সালে সঙ্গীত একাডেমী পুরস্কার, ১৯৫৮ সালে পদ্মভূষণ পুরস্কার, ১৯৭১ সালে পদ্ম-বিভূষণ, ১৯৬১ সালে বিশ্ব ভারতী প্রবর্তিত দেশিকোত্তম খেতাব প্রাপ্ত হন। ১৯৭২ সালে ৬ নভেম্বর এই সঙ্গীত সাধক পরলোকগমন করেন। প্রখ্যাত সুর স¤্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মৃতিবিজরিত সংগ্রহশালা ও তার বসবাসরত বাড়িটি রয়েছে এখনো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।

কিভাবে যাবেন : ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে এক কিলোমিটার দূরত্ব, পায়ে হেঁটে অথবা রিকশা করেও যাওয়া যাবে। সময় লাগবে ৫ মিনিট। সেখানে প্রবেশের জন্য কোনে টিকেট লাগবে না। সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

সিমনা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক

তিতাস নদী আর বিলের বুকে নির্মিত এই সড়ক ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে। খাল-বিল, নদী-হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিনিয়ত ভিড় করছেন অসংখ্য মানুষ। নবনির্মিত দৃষ্টিনন্দন এ সড়কটি ইতিমধ্যেই জেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে।

কিভাবে যাবেন : ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে ২. কিলোমিটার দুরত্ব, পায়ে হেটে অথবা রিকশা করেও যাওয়া যাবে। সময় লাগবে ১০ মিনিট।

আবি রিভার পার্ক

জেলা শহরের দক্ষিণ প্রান্তে কুরুলিয়া খালের (অ্যান্ডারসন খাল) তীরে জেলার একমাত্র ব্যাক্তি মালিকানায় গড়ে উঠা বিনোদন কেন্দ্র আবি রিভার পার্ক। ৪৮০ শতক জায়গা জুড়ে নান্দনিক পার্কে আছে দৃষ্টি নন্দন ফোয়ারা, নাগরদোলা, পাইরেট শিপ, টয় ট্রেন, মিনি চিড়িয়াখানা।

কিভাবে যাবেন : ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে ৩. কিলোমিটার দূরত্ব, অটোরিকশা করে যাওয়া যাবে। সময় লাগবে ২০ মিনিট। এই পার্কটি সপ্তাহের সাত দিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। পার্কে প্রবেশ মূল্য ১০০ টাকা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাকে শিল্প ও সংস্কৃতির রাজধানী খ্যাত বলা হলেও স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও ৩৩ লাখ জনপদের মানুষের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় কোন বিনোদন কেন্দ্র হয়নি এই জেলায়।

আরকে

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট