রোববার, ০৩ মে ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩

পরীক্ষায় পাস না করলে মিলবে না অনার্স ডিগ্রি, অটোপাসের প্রশ্নই আসে না

পরীক্ষায় পাস না করলে মিলবে না অনার্স ডিগ্রি, অটোপাসের প্রশ্নই আসে না

সংগৃহীত

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হাল ধরেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। বিশাল এই উচ্চশিক্ষা পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তাকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ সামলাতে হচ্ছে। একদিকে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সেশনজটের জট খোলা, অন্যদিকে এক বা দুই বিষয়ে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশের ‘অটোপাস’ বা বিশেষ বিবেচনায় পাসের দাবি। এমনকি আন্দোলনের নামে উপাচার্যকে ব্যক্তিগতভাবে বিব্রত করার ঘটনাও ঘটেছে কয়েকবার।

তবে, সব চাপের মুখেও শিক্ষার গুণগত মান রক্ষার প্রশ্নে নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সম্প্রতি ঢাকা পোস্টকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে উপাচার্য অটোপাস আন্দোলন, সেশনজট নিরসন, পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ঢাকা পোস্টের নিজস্ব প্রতিবেদক রাকিবুল হাসান তামিম। নিচে তা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো— 

ঢাকা পোস্ট : আপনি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সেশনজট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের বড় শত্রু। এটি নিরসনে আপনারা বর্তমানে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

২০২৫ সালে আমরা প্রায় ৩০০টি পরীক্ষা নিয়েছি, যেখানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ৩০ লাখ। আগে ফল প্রকাশে ৫-৬ মাস লাগত, সেখানে আমরা সর্বোচ্চ ৪৫ দিনে ফলাফল প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছি। ইতোমধ্যে ৪০ শতাংশ সেশনজট কমেছে। আশা করছি, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ৭০ শতাংশ এবং আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ নাগাদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট বলতে আর কিছুই থাকবে না

ড. এ এস এম আমানুল্লাহ : দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেখেছি সেশনজট একটি বিশাল ক্ষত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি দূর করতে আমরা জরুরি ভিত্তিতে কিছু ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ হাতে নিয়েছি। পরীক্ষার রুটিনগুলো এগিয়ে এনে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর সুফলও মিলছে— ২০২৫ সালে আমরা প্রায় ৩০০টি পরীক্ষা নিয়েছি, যেখানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ৩০ লাখ। আগে ফল প্রকাশে ৫-৬ মাস লাগত, সেখানে আমরা সর্বোচ্চ ৪৫ দিনে ফলাফল প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছি। ইতোমধ্যে ৪০ শতাংশ সেশনজট কমেছে। আশা করছি, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ৭০ শতাংশ এবং আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ নাগাদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট বলতে আর কিছুই থাকবে না।

dhakapost

ঢাকা পোস্ট : সম্প্রতি কিছু শিক্ষার্থীর ‘অটোপাস’ দাবি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল। এ বিষয়ে আপনার এবং প্রশাসনের চূড়ান্ত অবস্থান কী?

ড. এ এস এম আমানুল্লাহ : এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার— ‘জিরো টলারেন্স’। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধি অনুযায়ী অটোপাস দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা যদি অটোপাস দিই, তবে বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ধসে পড়বে। যারা এক বা দুই বিষয়ে অনুত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের পরীক্ষা দিয়েই পাস করতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী কেউ যদি ৩০ পায়, তবে আমরা সর্বোচ্চ ১০ নম্বর ‘গ্রেস’ দিয়ে তাকে পাস করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কেউ ৫ বা ১০ পেলে তাকে ৪০ নম্বর দেওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব। প্রতি ব্যাচে প্রায় ১০-১৫ হাজার শিক্ষার্থী অটোপাস চাচ্ছে, যা যৌক্তিক নয়। তবে যাদের জরুরিভাবে শুধু একটি গ্র্যাজুয়েশন সার্টিফিকেট প্রয়োজন, তারা ক্রেডিট পয়েন্ট রিভিউ করে জেনারেল সার্টিফিকেট নিতে পারে। কিন্তু অটোপাস কোনো সমাধান নয়।

ঢাকা পোস্ট : খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের অবহেলার অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। এ বিষয়ে আপনারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন কি?

ড. এ এস এম আমানুল্লাহ : এই অভিযোগের কিছুটা সত্যতা আছে। আমরা দেখেছি, পুনর্মূল্যায়নের আবেদনের পর প্রায় ৮-৯ হাজার শিক্ষার্থী পাস করে যায়। এর অর্থ হলো, কিছু শিক্ষক খাতা দেখার ক্ষেত্রে যথেষ্ট মনোযোগী নন। আমরা এখন কঠোর হচ্ছি। যদি পুনর্মূল্যায়নে কোনো শিক্ষার্থী পাস করে, তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। খাতা দেখার এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে আমরা শিক্ষকদের উদ্বুদ্ধ করছি এবং প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপও নিচ্ছি।

ঢাকা পোস্ট : পাঠ্যক্রম বা সিলেবাস পরিবর্তনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

ড. এ এস এম আমানুল্লাহ : গত ৩২ বছরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমরা প্রথমবারের মতো পুরো সিলেবাস আধুনিকায়ন করেছি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা মাথায় রেখে আইসিটি এবং ইংরেজি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষ জনবল তৈরিতে আমরা ১২ হাজার শিক্ষককে আইসিটি প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডাটা সায়েন্স ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের মতো বিষয়গুলোকে আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি। আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে আমরা ইংল্যান্ড ও আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ শুরু করেছি।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা মাথায় রেখে আইসিটি এবং ইংরেজি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষ জনবল তৈরিতে আমরা ১২ হাজার শিক্ষককে আইসিটি প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডাটা সায়েন্স ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের মতো বিষয়গুলোকে আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি। আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে আমরা ইংল্যান্ড ও আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ শুরু করেছি

ঢাকা পোস্ট : অনেক সরকারি ও বেসরকারি কলেজে ল্যাব বা অবকাঠামোগত সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিখতে পারছে না। এ বিষয়ে আপনাদের পর্যবেক্ষণ কী?

ড. এ এস এম আমানুল্লাহ : এটি একটি জাতীয় সমস্যা। অবকাঠামোগত উন্নতির জন্য শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। আমরা ইতোমধ্যে একটি ‘কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর’ (কেপিআই) স্টাডি শেষ করেছি। কোন কলেজে ল্যাব আছে বা নেই, থাকলেও তা কার্যকর কি না— তা আমরা চিহ্নিত করছি। যেখানে ল্যাব সুবিধা নেই, সেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে আমরা প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিচ্ছি।

 

dhakapost

ঢাকা পোস্ট : ছাত্র রাজনীতি এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাই।

ড. এ এস এম আমানুল্লাহ : আমি মনে করি ছাত্র সংসদ প্রয়োজন, কিন্তু তার আগে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। গত ১৫ বছরে কলেজগুলোকে যেভাবে অতি-রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে, তা থেকে আমরা বের হতে চাই। ক্যাম্পাসগুলোতে স্থানীয় রাজনৈতিক আধিপত্য কমাতে আমরা ‘ডি-পলিটিসাইজেশন’-এর ওপর জোর দিচ্ছি। শিক্ষার্থীরা সচেতন থাকবে, কিন্তু তাদের মূল লক্ষ্য হবে পড়াশোনা। কলেজের পরিবেশ পুরোপুরি ফিরে আসলে আমরা পর্যায়ক্রমে ছাত্র সংসদের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করব।

আরও পড়ুন

আমরা বসে নেই, হোমওয়ার্ক শেষ করেই মাঠে নেমেছি : শিক্ষামন্ত্রী

‘ডিউটি ৬ ঘণ্টা ট্রান্সপ্ল্যান্টে ১৪ ঘণ্টা’, কিডনি প্রতিস্থাপনে দুর্বলতা

পাঁচ বছরের মধ্যে র‌্যাংকিংয়ে সম্মানজনক অবস্থানে যেতে চাই

ঢাকা পোস্ট : অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য আপনারা নতুন কী করছেন?

ড. এ এস এম আমানুল্লাহ : আমরা বৃত্তির সংখ্যা এবং অর্থের পরিমাণ— উভয়ই দ্বিগুণ করেছি। জুলাই আন্দোলনে শহীদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ শিক্ষার্থীর পরিবারকে আমরা ইতোমধ্যে ৮ লাখ টাকা করে অনুদান দিয়েছি। এছাড়া শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি এবং অন্যান্য খরচে সহায়তা করতে আমরা বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে ‘শিক্ষা লোন’ বা এডুকেশন লোনের বিষয়ে আলোচনা করছি, যাতে তারা পড়াশোনা শেষে চাকরিতে যোগ দিয়ে তা পরিশোধ করতে পারে।

 

dhakapost

ঢাকা পোস্ট : সবশেষে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

ড. এ এস এম আমানুল্লাহ : আমরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক ও কর্মমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাই। নকলমুক্ত পরীক্ষা, সময়মতো রেজাল্ট এবং আন্তর্জাতিক মানের সিলেবাস আমাদের অগ্রাধিকার। আমি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানাই।

ঢাকা পোস্ট : আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।

ড. এ এস এম আমানুল্লাহ : ধন্যবাদ ঢাকা পোস্টকেও।

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

জনপ্রিয়