বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩

পশ্চিমবঙ্গে কে হচ্ছেন বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী?

পশ্চিমবঙ্গে কে হচ্ছেন বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী?

সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিজেপি। সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশরও বেশি গরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করার পর রাজ্যে বিজেপির সরকার গঠনে এখন শুধু কয়েকটা দিনের অপেক্ষা।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগেই রাজ্যে নির্বাচনী প্রচারে এসে ঘোষণা করে গেছেন, বিজেপি জিতলে সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তিনি নিজে উপস্থিত থাকবেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শপথ নেবেন প্রধানমন্ত্রী মোদির উপস্থিতিতেই। 

কিন্তু সেই মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন? বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে কোনো নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে বিজেপি তুলেও ধরেনি।

সাম্প্রতিক অতীতে এটাও দেখা গেছে, রাজস্থান, দিল্লি, ওড়িশা বা মধ্যপ্রদেশের মতো বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপি কাউকে মুথ্যমন্ত্রী হিসেবে তুলে না ধরলেও ভোটে জেতার পর সম্পূর্ণ অপরিচিত ও নতুন কাউকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গেও তারা সেই একই রাস্তা নিতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করছেন, আবার যে নামগুলো নিয়ে জল্পনা রয়েছে, তার মধ্যে থেকেও কাউকে পর্যবেক্ষকরা বেছে নিতে পারেন বলে অনেকে ধারণা করছেন। 

কিন্তু কে কে আছেন বিজেপির সেই সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রীদের তালিকায়? তাদের পক্ষে বা বিপক্ষে যুক্তিগুলোই বা কী কী? দেখে নেওয়া যাক একে একে সেই নামগুলো।

শুভেন্দু অধিকারী
পশ্চিমবঙ্গে গত পাঁচ বছর ধরে বিধানসভায় যিনি বিরোধী দলনেতা এবং বিজেপির প্রধান মুখ হিসেবে ছিলেন, সেই শুভেন্দু অধিকারী এবারের নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর দুটো আসনেই জিতেছেন। শুধু তাই নয়, ভবানীপুরে তিনি হারিয়েছেন  মমতা ব্যানার্জীকে, অথচ এই ভবানীপুরসহ গোটা দক্ষিণ কলকাতা মমতা ব্যানার্জীর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। 

শুধু তাই নয়, ২০২১-এর নির্বাচনে বিজেপি হারার পরও দলের যে নেতা গত পাঁচ বছর ধরে মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন এবং তৃণমূলের সঙ্গে সমানে টক্কর নিয়ে গেছেন, তিনি অবশ্যই শুভেন্দু অধিকারী।

মূলত এই সব কারণেই মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য তিনি অবশ্যই প্রধান দাবিদার বা ‘ফ্রন্টরানার’। কিন্তু তিনি বিজেপির জন্য একমাত্র অপশন নন বা ‘অটোমেটিক চয়েস’ও নন।

শুভেন্দু অধিকারী বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন মাত্রই সাড়ে পাঁচ বছর আগে, তার আগে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা ও মমতা ব্যানার্জীর আস্থাভাজন ছিলেন। বিজেপির পুরনো নেতাদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা কম।

বিজেপির নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে যেহেতু দলটির আদর্শিক অভিভাবক আরএসএসের একটা প্রভাব থাকে বলে ধারণা করা হয়, তাই এই ফ্যাক্টরটিও শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে যেতে পারে। 

স্বপন দাশগুপ্ত
বিজেপির তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে পরিচিত স্বপন দাশগুপ্ত বিলেতে শিক্ষিত ইতিহাসবিদ, বহুদিন তিনি সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন। ২০১৬ সালে বিজেপি সরকারের আমলে তিনি রাষ্ট্রপতির মনোনীত সদ্য হিসেবে রাজ্যসভার এমপি হন, পরে ২০২১ সালে নির্বাচনে লড়ার জন্য একবার ইস্তফা দেওয়ার পরেও তাকে আবার পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে মনোনীত করা হয়।

২০১৫ সালে তিনি ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব ‘পদ্মভূষণে’ সম্মানিত হন। দক্ষিণপন্থী কলামনিস্ট হিসেবেও তার পরিচিতি আছে।

এবারে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তিনি দক্ষিণ কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে রাসবিহারী আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের হেভিওয়েট প্রার্থী দেবাশিস কুমারকে বড় ব্যবধানে হারিয়েছেন। পাঁচ বছর আগেকার বিধানসভা নির্বাচনে তিনি অবশ্য হেরে গিয়েছিলেন।

কলকাতা ও সংলগ্ন শহরতলি এলাকায় বিজেপি এই প্রথমবারের মতো বেশ কিছু আসন পেয়েছে এবং স্পষ্টতই তারা এই নতুন সমর্থকদের ধরে রাখার ও আরও বাড়ানোর চেষ্টা করবে।

তবে স্বপন দাশগুপ্তর মাঠেঘাটের রাজনীতিতে বা সংগঠন চালনোর কোনো অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে, সেটা তার বিরুদ্ধে যেতে পারে। 

শমীক ভট্টাচার্য
বিজেপির বর্তমান রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সম্বন্ধে বলা হয়ে থাকে, সাংবাদিকরা অস্বস্তিকর প্রশ্ন করলেই তিনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা থেকে কয়েক লাইন বলে দিয়ে সেই প্রশ্ন এড়ানোর চেষ্টা করে থাকেন।

আসলে বিজেপিতে অটলবিহারী বাজপেয়ীকে যেমন একটা সময় নেতৃত্বের উদার, সহিষ্ণু মুখ বলে ধরা হতো, তেমনি পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিতেও শমীক ভট্টাচার্যকে সেই ঘরানার প্রতিনিধি বলেই ধরা হয়ে থাকে।

তিনি পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আরএসএস সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, সেটাও তার পক্ষে যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিতেও তিনি কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে সেভাবে যুক্ত নন।

২০১৪ সালে বসিরহাট দক্ষিণ আসনের উপনির্বাচনে জিতে তিনি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রথম এমএলএ হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। তবে সুবক্তা হিসেবে শমীক ভট্টাচার্যর সুখ্যাতি থাকলেও তিনি সেই মাপের জননেতা নন, তার সাংগঠনিক দক্ষতাও সেভাবে পরীক্ষিত নয়।

তবে তথাকথিত ফ্রন্টরানারদের কাউকে নিয়ে বিজেপির হাইকমান্ড একমত হতে না পারলে ‘কম্প্রোমাইজ ক্যান্ডিডেট’ বা আপসের প্রার্থী হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী পদে শমীক ভট্টাচার্যর শিকে ছিঁড়তে পারে বলেও অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন। 

অগ্নিমিত্রা পাল
পেশায় ফ্যাশন ডিজাইনার অগ্নিমিত্রা পাল বছর সাতেক আগে প্রথম রাজনীতিতে যোগ দিয়ে বিজেপির সদস্য হয়েছিলেন।

২০২১ সালের নির্বাচনে তিনি নিজের শহরে আসানসোল থেকে প্রথমবারের মতো বিজেপি টিকিটে জিতে এমএলএ হন। এবারের নির্বাচনেও তিনি সেই জয়ের ধারা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন।

মমতা ব্যানার্জীর একটানা পনেরো বছরের শাসনের অবসানের পর বিজেপি যে নতুন সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, সেটা কোনো নারীর নেতৃত্বে হওয়া উচিত বলেই দলের ভেতরে একটা জোরালো মতবাদ রয়েছে।

গত বছর দিল্লি বিধানসভায় বিজেপি জেতার পরও তারা রেখা গুপ্তার মতো অপরিচিত নারী নেত্রীকেই মুখ্যমন্ত্রী করেছিল।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব যদি একই ধরনের যুক্তি প্রয়োগ করেন তাহলে অগ্নিমিত্রা পালকে বেছে নেওয়ার একটা ভালো সম্ভাবনা আছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন।

তবে রাজনীতিতে তুলনায় অনভিজ্ঞ কাউকে বিজেপি শেষ পর্যন্ত এত গুরুত্বপূর্ণ পদে বেছে নেবে, বিজেপির রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত অনেকে আবার সেটা বিশ্বাস করেন না।

স্মৃতি ইরানি
বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নির্বাচনের সময় কথা দিয়েছেন— কোনো বাঙালিই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হবেন। এখন বিজেপি বাঙালির যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করে থাকে, সেই অনুযায়ী সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র স্মৃতি ইরানিও নিজেকে বাঙালি বলেই দাবি করতে পারেন এবং তিনি ঝরঝরে বাংলা ভাষায় কথাও বলতে পারেন।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে তিনি পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্তে বিজেপির হয়ে লাগাতার প্রচারণা করেছেন। এমন কি নিজের বাঙালি পরিচয় তুলে ধরতে এমনও বলেছেন, ‘আমি বাংলার বাগচী বাড়ির মেয়ে, ইলিশ মাছের কাঁটাও বেছে খেতে জানি!’

ফলে বিজেপি যদি রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কোনো নারী নেত্রীকে বেছে নিতে চায়, তাহলে স্মৃতি ইরানির নামও বিবেচনা করা হতে পারে বলে কেউ কেউ ধারণা করছেন।

২০১৯ সালে আমেঠি লোকসভা আসনে রাহুল গান্ধীকে হারিয়ে চমক দিয়েছিলেন স্মৃতি ইরানি, তারও আগে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির প্রথম ক্যাবিনেটে পেয়েছিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব।

২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে আমেঠিতে হেরে যাওয়ার পর তিনি দলের ভেতরে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এখন পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে দল তাকে রাজনৈতিক পুনর্বাসন দেয় কি না সেটাই দেখার। 

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

জনপ্রিয়