সংগৃহীত
নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক শোরগোলের মধ্যে আবারও ভূমিকম্প! ২০১৩ সালে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির তৈরি একটি ইনডেক্সে ঢাকা বিশ্বের প্রথম ২০টি ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। ১৯৬১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত, প্রতি ১০ বছরে ভূমিকম্পের ঘটনা ২ থেকে ক্রমান্বয়ে ৩৮-এ পৌঁছায়।
২০২৫ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে যখন ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে একটি অনলাইন প্লাটফর্মে আলোচনা করছিলাম, তখন দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি যে তার ঠিক সাত আট মাস পর, ২১ নভেম্বর ২০২৫ সকালে, জীবনে প্রথম এরকম মৃত্যুভয়ের মুখোমুখি হবো। সেদিন ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের সময় আমি ও আমার ছেলে লিফটের ভেতর ছিলাম।
নিচতলা থেকে পাঁচ তলায় যাওয়ার পথে লিফট থেমে যায় এবং শুরু হয় প্রচণ্ড ঝাঁকুনি। ওই পুরো ২৬ সেকেন্ড আমরা লিফটের ভেতর মৃত্যুভয়ে কাঁপছিলাম, আর নিজের বলা কথাগুলো মাথায় ঘুরছিল—পায়ের তলার মাটি তো কেঁপেই যাচ্ছে। তবুও আমাদের চিন্তার জগতকে কাঁপাতে পারছে না কেন? আমরা বোধহয় শেষ মরণ ঝাঁকুনিটার জন্য অপেক্ষা করছি। সেই মরণ কাঁপুনি চলেই এলো!
তারপর বিস্মৃতিপরায়ণ আমরা রাজনীতি ও নির্বাচনের ডামাডোলে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম। সাম্প্রতিক কিছুদিনের উপর্যুপরি কম্পন আবার আমাদের টনক নড়িয়েছে।
কিন্তু ঘুরেফিরে সেই নভেম্বরের জিজ্ঞাসাগুলোই আবার ফিরে এলো—কোথাও কোনো পদক্ষেপের আওয়াজ কি পাচ্ছেন? আমি বা আপনি কি কোনো উদ্যোগ নিয়েছি দুর্যোগকালীন বিপদ মোকাবিলার?
রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যারা এসেছেন, তাদের কি ভূমিকম্প দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ পরবর্তী পরিস্থিতি সামলানোর রোড ম্যাপ আছে? বর্তমান ক্ষমতাসীন দল কি বুঝতে পারছেন যে ভূমিকম্পের কারণে যে বিপুল অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি ও জীবন নাশ হবে, সেটা তাদের জন্য কত বড় একটা দায়বদ্ধতার জায়গা?
ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঢাকা শহরে যে অস্থিতিশীল, অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করবে, তার একটি বড় ধাক্কা আসবে ঢাকা শহরের নারী ও শিশুদের ওপরে। ধসে যাওয়া শহরে পানি, বিদ্যুৎ, বাসস্থানে সবকিছুর অব্যবস্থার মধ্যে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে, গোটা শহরের সামাজিক পরিবেশের ভারসাম্যের অংশ হিসাবেও মোকাবিলা করা জরুরি।
আমরা কতটুকু প্রস্তুত ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য, সেই প্রশ্নের উত্তর ২০১৩ সালে ভূমিকম্পজনিত কোনো কাঁপুনি ছাড়াই আট তলা গার্মেন্টস ভবন রানা প্লাজার মর্মান্তিক ধস ঘটে, শুধুমাত্র স্ট্রাকচারাল দুর্বলতার কারণে। মৃত্যুবরণ করেন ১১৩৪ জন মানুষ। আহত হন আরও আনুমানিক আড়াই হাজার মানুষ।
রানা প্লাজা ধসের পর সরকারি পর্যায়ে ভবনের স্ট্রাকচারাল সুরক্ষা নিয়ে কিছুটা নাড়াচাড়া পড়লেও ভূমিকম্প রোধের জন্য যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তার প্রমাণ ২০২২ সালে রাজউকের করা একটি সার্ভে। পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে আসে যে, টাঙ্গাইল মধুপুর ফল্টলাইনে মাত্র ৬.৯ ম্যাগনিচিউডের ভূমিকম্পই ধসিয়ে দেবে ঢাকা শহরের প্রায় ৮ লাখ ৬৫ হাজার ভবন। সার্ভে করা ১.৯৫ লাখ ভবনের মধ্যে ৬৭ শতাংশ ভবনেই নির্মাণ বিধিমালা অমান্য করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঢাকা শহরে যে অস্থিতিশীল, অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করবে, তার একটি বড় ধাক্কা আসবে ঢাকা শহরের নারী ও শিশুদের ওপরে।
ঢাকা শহর ক্রমান্বয়ে কীভাবে, কার কারণে, কতদিন ধরে এই অসম্ভব দুর্দশাময় অবস্থায় পৌঁছল, যার দুর্যোগ মোকাবিলার ন্যূনতম ক্ষমতা নেই, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করার প্রকল্পটি কেন আলোর মুখ দেখল না, সেইসব বিশ্লেষণে যাওয়ার মতো সময় এখন আর আমাদের হাতে নেই।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী হাসান আনসারী বলেছেন, বড় ভূমিকম্প আমাদের দোরগোড়ায়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সরকার ভূমিকম্পের বিষয়টি গুরুত্বই দিচ্ছে না। সাত মাত্রার ভূমিকম্প হলে ফায়ার সার্ভিসও খুঁজে পাওয়া যাবে না। রাস্তায় এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল পড়ে থাকবে। গাড়ি চলার সুযোগও থাকবে না।
ভূমিকম্প প্রতিরোধী করার জন্য দালানকোঠা পুনরায় সংস্কার করবেন? এত সময় বা সামর্থ্য ও আমাদের নেই। যখন জীবন বাঁচানোই মূল লক্ষ্য তখন কী করবেন? পালাবেন বা আপনাকে উদ্ধার কর্মীরা এসে উদ্ধার করবে, তাই তো? না বোধহয়।
এনএফপিএ (USA), ইউকে বিল্ডিং রেগুলেশন্স, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (NBC) এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) অনুযায়ী উদ্ধারকারী যানবাহনের জন্য ন্যূনতম ৪.৫ মিটার প্রস্থের রাস্তা লাগে। ড্যাপ ২০১৫-২০২২ ও বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট-এর পরিবেশ উপকমিটির সাম্প্রতিক একটি গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, ঢাকার আনুমানিক ৭২ শতাংশ রাস্তা ৪.৫ মিটারের কম প্রস্থের।
তাই উদ্ধার হওয়ার আশা আপাতত অলীক কল্পনা। যেটুকু করা যায় তা হলো, নিজ বিল্ডিং-এর কাঠামোগতভাবে মজবুত অংশ যেমন কলাম/লিফট কোরের দেয়াল, যেটা ভূমিকম্পের ধাক্কা সহ্য করতে পারবে, সেখানে বড় করে লিখে রাখুন ‘ভূমিকম্পের সময় এখানে দাঁড়ান’।
প্রতি ফ্লোরে লাগান এই সাইন যেন ওই ফ্লোরের সবাই নির্দিষ্ট স্পটে আশ্রয় নেয়। নমুনা হিসেবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের কিছু সাইনেজের ছবি দেখে আসতে পারেন। বাসা, প্রতিষ্ঠান,অফিস সর্বত্র এই সাইনেজগুলো ইমার্জেন্সি প্রায়োরিটি হিসেবে লাগানো উচিত।
ওই নিরাপদ স্পট পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে কোনো ভারী স্যুভেনির, কাঠের ভারী বা কাঁচের আলমারি কিছু থাকলে সরিয়ে ফেলুন। নির উদ্যোগে এলাকাভিত্তিক কিছু দুর্যোগকালীন নির্গমন পথ এবং সংলগ্ন কিছু খালি জমি খুঁজে বের করুন। যেখানে খোলা আকাশের নিচে একত্র হতে পারবেন।
পারলে সেই রুটগুলো নিয়ন সাইন দিয়ে রং করে দিন এলাকার মানুষ নিয়ে। আর সেই জরুরি নির্গমন পথ/রাস্তা বাধাহীন রাখুন। পারলে দ্রুত ছাউনি তৈরি করুন রাস্তার কিনারা ধরে যেন বিল্ডিং থেকে ভাঙা কাঁচ, রেলিং মাথার ওপর না পড়ে।
ক্ষমতা, গণতন্ত্র নিয়ে প্রতিদিন আমাদের কত আলাপ। কিন্তু প্রতিদিন এই ঢাকায় ভূমিকম্পের বিপদে থাকা মানুষগুলোর সামগ্রিক জনস্বার্থ নিয়ে আসলে আমরা কতটা ভাবি? কতটা ভাবেন নীতিনির্ধারকরা?
ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য সংস্থার অধীনে সেই ৭২ শতাংশ, ৪.৫ মিটার কম প্রস্থের রাস্তা উপযোগী উদ্ধারকারী, ছোট যানবাহনের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্থানীয় সরকারকে পরামর্শ দিন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাত ১১ টার পর তালা/ডাবল তালা দিয়ে গেট বন্ধ করবেন না। অন্তত এই কয়দিন, নিজের স্থাবর সম্পত্তি থেকে নিজের ও অন্যের জীবনকে একটু বেশি গুরুত্ব দিন। সবাই যেন বের হতে পারে দুর্যোগ মুহূর্তে তা নিশ্চিত করুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ঢাকায় এত জনসংখ্যার চাপ, এইরকম বেশি জনঘনত্বের শহরকে ভূমিকম্পরোধী করার কোনো উদ্যোগ নেই কেন? সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে আমরা কি স্থিতিস্থাপক নগরায়ন এবং ভূমিকম্প থেকে সুরক্ষিত ভবন নিয়ে কোনো কার্যকর নীতিমালা বা পরিকল্পনা করেছি?
ভূমিকম্প প্রতিরোধক নগরায়ন সংক্রান্ত দিকনির্দেশনার জন্য ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে গ্লোবাল ফ্যাসিলিটি ফর ডিজাস্টার রিডাকশন অ্যান্ড রিকভারি (Global Facility for Disaster Reduction and Recovery-GFDRR) গঠন করা হয়েছিল। ২০১৪ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে আরবান রিস্ক এসেসমেন্ট (URA) গাইডলাইন প্রকাশিত হয়। এই ডকুমেন্ট বলছে, শহরের আসন্ন দুর্যোগগুলো নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল তা আসলে কতদূর এগিয়েছে? আমরা কি ওই উদ্যোগগুলো সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি?
ক্ষমতা, গণতন্ত্র নিয়ে প্রতিদিন আমাদের কত আলাপ। কিন্তু প্রতিদিন এই ঢাকায় ভূমিকম্পের বিপদে থাকা মানুষগুলোর সামগ্রিক জনস্বার্থ নিয়ে আসলে আমরা কতটা ভাবি? কতটা ভাবেন নীতিনির্ধারকরা?
এখনই সময় এগুলো নিয়ে ভাবার। মনে রাখবেন, ন্যায্য রাজনীতি, বৈষম্যহীনতার তখনই অর্থপূর্ণ যখন তা আপনাকে নিরাপদ, সুস্থ জনজীবনের নিশ্চয়তা দেয়। তাই নিরাপদ থাকার চেষ্টা করি নিজেরাও। বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণের ডামাডোলের মধ্যেও যেন প্রকৃতির অশনি সংকেত নিয়ে আমরা ভাবি ও দুর্যোগরোধী, স্থিতিস্থাপক শহর তৈরিতে এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসি।
ড. নবনীতা ইসলাম : সহযোগী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়; সদস্য, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (বাস্থই)
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট
.webp)
















