সংগৃহীত
দই বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাটির সরা আর ক্ষীরসা রঙের এক লোভনীয় মিষ্টান্ন। বর্তমানে আমাদের সামাজিক অনুষ্ঠান ও অতিথি আপ্যায়নে দই ছাড়া যেন চলেই না। সকলের পছন্দের এই লোভনীয় মিষ্টান্নের ইতিহাস শুরু হয় মূলত বগুড়ার শেরপুর উপজেলা থেকে। স্থানীয়দের মতে সনাতন ঘোষ সম্প্রদায় দই তৈরি করে শেরপুর তথা বগুড়া জেলাকে দেশের সর্বত্র পরিচিত করে তুলেছিল। পরবর্তীতে ঘোষদের হাত ধরে ধীরে ধীরে এটি মুসলিম সম্প্রদায়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের অধীনে চলে যায়।
জানা যায়, বগুড়ার শেরপুরে প্রথম দই তৈরি হয় প্রায় আড়াইশ বছর আগে। তৎকালীন শেরপুরের ঘোষ পরিবারের ঘেটু ঘোষ প্রথম দই তৈরি আরম্ভ করেন। টক দই তৈরি থেকে বংশপরম্পরায় তা মিষ্টি দইয়ে রূপান্তরিত হয়। আর কালের বিবর্তনে স্বাদের বৈচিত্র্যের কারণে দইয়ের বহুমুখী ব্যবহার শুরু হয়। বর্তমানে টক দই দিয়ে মেজবানি রান্না ও ঘোল তৈরি হয় এবং অতিথি আপ্যায়নে চলে মিষ্টি দই। এই শিল্পের স্বর্ণযুগ ছিল স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে। সে সময় এর প্রস্তুত প্রণালী ছিল অতি গোপনীয় এবং ঘোষেরা যখন দই তৈরি করত তখন গোপনীয়তা বজায় রাখত। ফলে বাইরের কেউ দই তৈরি করতে পারত না। তবে বর্তমানে সেই গোপনীয়তা আর নেই এবং শেরপুরেই অনেক ব্যবসায়ী দই তৈরি করছেন।
জিআই পণ্য হিসেবে ২৬ জুন ২০২৩ তারিখে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে শেরপুর তথা বগুড়ার দইকে স্বীকৃতি প্রদান করে। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী শেরপুরে প্রায় দুই শতাধিক দইয়ের কারখানা বিদ্যমান যেখানে কাজ করেন তিন হাজারের বেশি কর্মচারী। এছাড়া বিক্রয় কেন্দ্রের কর্মচারীসহ প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার জনশক্তি প্রত্যক্ষভাবে এই শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত।
শেরপুর উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ মণ দই উৎপাদনের পাশাপাশি ক্ষীরসা ঘি ও মিষ্টিসহ মাসে প্রায় ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেনদেন হয়। সরাসরি বিক্রয় কেন্দ্রের পাশাপাশি উপজেলার বহু তরুণ উদ্যোক্তা অনলাইনেও দই বিক্রি করে থাকেন। ব্যবসায়ী শ্যামল কুমার বসাক জানান তারা চেষ্টা করছেন ঐতিহ্যের স্বাদ ধরে রাখতে। যদিও দুধ ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ায় দইয়ের দাম কিছুটা বেড়েছে। দই কিনতে আসা ফেনীর তৌহিদ হোসেন জানান অতুলনীয় স্বাদের কারণেই তিনি বারবার শেরপুরে ছুটে আসেন। আড়াইশ বছরের এই ঐতিহ্য এখন কেবল খাবার নয় বরং বগুড়ার এক গর্বিত পরিচয়।















