সংগৃহীত
সনদনির্ভর শিক্ষা থেকে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষার বড় রূপান্তরের পথে হাঁটছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ থেকে বিদেশি ভাষা শিক্ষা, এআইভিত্তিক পাঠ্যক্রম থেকে পৃথক এক্সাম সেন্টারসহ প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে বিস্তৃত এক মহাপরিকল্পনা। যার লক্ষ্য দেশের সর্ববৃহৎ উচ্চশিক্ষা নেটওয়ার্ককে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কার্যকর প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা।
এই পরিকল্পনার আওতায় শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক কর্মবাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে কলেজ পর্যায়েই চালু হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ, প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে ক্যারিয়ার সেন্টার এবং শেখানো হবে সাতটি বিদেশি ভাষা। একই সঙ্গে পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার সিকিউরিটি, আউটসোর্সিং ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতাভিত্তিক বিষয়।
আগামী ৭ জুন থেকে দেশজুড়ে একযোগে ১২ হাজার শিক্ষকের আইসিটি ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হবে। এটুআই, আইসিটি বিভাগ ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের সহায়তায় ইতোমধ্যে ৮৯ জন কোর ট্রেইনার এবং ৮৪০ জন মাস্টার ট্রেইনার প্রস্তুত করা হয়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রতিষ্ঠানটিকে শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নয়, বরং দেশের সবচেয়ে বড় দক্ষতা উন্নয়ন প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়েই এগোনো হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সেশন জট, দক্ষতার ঘাটতি এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার দুর্বল সংযোগ নিয়ে যে সমালোচনা ছিল, নতুন পরিকল্পনাগুলো তারই কাঠামোগত সমাধান খোঁজার চেষ্টা।
এই রূপান্তরের প্রথম ধাপ শুরু হচ্ছে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। আগামী ৭ জুন থেকে দেশজুড়ে একযোগে ১২ হাজার শিক্ষকের আইসিটি ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হবে। এটুআই, আইসিটি বিভাগ ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের সহায়তায় ইতোমধ্যে ৮৯ জন কোর ট্রেইনার এবং ৮৪০ জন মাস্টার ট্রেইনার প্রস্তুত করা হয়েছে। মোট ৯৩০ জন প্রশিক্ষকের এই নেটওয়ার্ক মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য কন্টিনিউয়াস প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট (সিপিডি), নৈতিকতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচিও অব্যাহত থাকবে।
দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে ভাষা শিক্ষাকে নতুনভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘মাল্টি ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউট’। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি সেখানে শেখানো হবে ম্যান্ডারিন, জাপানিজ, কোরিয়ান, আরবি, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ এবং ফ্রেঞ্চ ভাষা।
শিক্ষার্থীদের সরাসরি কর্মবাজারের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্যেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে পাঠ্যক্রমে। নতুন আইসিটি কোর্সে যুক্ত করা হয়েছে সাইবার সিকিউরিটি, আউটসোর্সিং, ডেটা প্রসেসিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো বিষয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী এই প্রশিক্ষণের আওতায় আসবে। সংশ্লিষ্টদের হিসাব বলছে, এর মাধ্যমে প্রতি বছর অন্তত দুই লাখ দক্ষ আইটি জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে।
শুধু দক্ষতা অর্জন নয়, সেই দক্ষতার ব্যবহার নিশ্চিত করতেও নেওয়া হয়েছে আলাদা উদ্যোগ। প্রতিটি কলেজে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে ‘ক্যারিয়ার সেন্টার’। এসব কেন্দ্র থেকে শিক্ষার্থীরা ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ, চাকরির সাক্ষাৎকার প্রস্তুতি, ইন্টার্নশিপ এবং ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সুবিধা পাবেন। দক্ষতা উন্নয়নের কোনো ক্ষেত্রগুলোতে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে, তা নির্ধারণে ইউনিসেফের সহযোগিতায় একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও পরিচালিত হচ্ছে।
পাশাপাশি দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে ভাষা শিক্ষাকে নতুনভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘মাল্টি ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউট’। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি সেখানে শেখানো হবে ম্যান্ডারিন, জাপানিজ, কোরিয়ান, আরবি, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ এবং ফ্রেঞ্চ ভাষা। একই সঙ্গে কলেজভিত্তিক ভাষা ক্লাব গঠনের কাজও শুরু হয়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অন্যতম ভোগান্তি সেশন জট। প্রায় সারা বছরই বিভিন্ন বর্ষের পরীক্ষা চলার কারণে অনেক কলেজে নিয়মিত ক্লাস ব্যাহত হয়। এই সমস্যা সমাধানে প্রথমবারের মতো পৃথক ‘ন্যাশনাল এক্সাম সেন্টার’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ে ৩০০ এবং পরে দেশের ৫০০ উপজেলায় এসব কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারকে মাথায় রেখে আরবি ভাষা শিক্ষা ও সফট স্কিল উন্নয়নের ওপর বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রতিটি কলেজকে ইংরেজি, বাংলা ও আরবি বিভাগের শিক্ষকদের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের ভাষা ক্লাব গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক জরিপে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ম্যান্ডারিন, জাপানিজ এবং স্প্যানিশ ভাষার প্রতি আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অন্যতম ভোগান্তি সেশন জট। প্রায় সারা বছরই বিভিন্ন বর্ষের পরীক্ষা চলার কারণে অনেক কলেজে নিয়মিত ক্লাস ব্যাহত হয়। এই সমস্যা সমাধানে প্রথমবারের মতো পৃথক ‘ন্যাশনাল এক্সাম সেন্টার’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ে ৩০০ এবং পরে দেশের ৫০০ উপজেলায় এসব কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। আন্তর্জাতিক দুটি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ইতোমধ্যে প্রকল্পটিতে সহায়তার আগ্রহ জানিয়েছে। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে নিয়মিত ক্লাস বন্ধ না রেখেই পরীক্ষা পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণকেও রূপান্তর পরিকল্পনার অংশ করা হয়েছে। ‘ওয়ান স্টুডেন্ট ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির আওতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী বছরে অন্তত একটি করে গাছ রোপণ করবে। সেই হিসাবে বছরে প্রায় ৪০ লাখ এবং পাঁচ বছরে দুই কোটি ফলদ ও ঔষধি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন কলেজে এ কর্মসূচির কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
প্রশাসনিক কাঠামোতেও আনা হচ্ছে পরিবর্তন। ২ হাজার ৫০০ কলেজের গভর্নিং বডি পুনর্গঠন, জেলাভিত্তিক মনিটরিং কমিটি গঠন এবং ছয়টি নতুন আঞ্চলিক কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২০১১ সালে চাকরিচ্যুত ৯৮৮ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে পুনর্বহাল করা হয়েছে।
সামাজিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেও কয়েকটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ২৫টি কলেজের ২৬ জন শিক্ষার্থীর পরিবারের প্রত্যেককে আট লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের চাকরিতে অগ্রাধিকার এবং বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।
পুরোনো ধারা বদলে দিতে চাই। দেশের উচ্চশিক্ষায় দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানমুখী করে গড়ে তুলতে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ, উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে আরও জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক বিকাশের জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কর্মসূচির আওতায় ২৫ থেকে ৩৫ লাখ শিক্ষার্থীকে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের আটটি বিভাগে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষায়িত কলেজ এবং প্রতিটি জেলায় একটি করে মোট ৬৪টি সংগীত কলেজ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে।
ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রেও আসছে নতুন সুবিধা। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইল আইডি, স্মার্ট ক্লাসরুম এবং বিনা সুদে শিক্ষা ঋণ চালুর উদ্যোগ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। বড় কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময় ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন এবং চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় তা পরিশোধ করার সুযোগ পাবেন।
সার্বিক বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষায় দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানমুখী করে গড়ে তুলতে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রায় আড়াই হাজার কলেজে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী শ্রমবাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার, আইসিটি বিভাগ, এটুআই ও ইউনিসেফের সহযোগিতায় দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম চালু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পুরোনো ধারা বদলে দিতে চাই। আমরা কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি বিশেষ জোর দিচ্ছি। নতুন পাঠ্যক্রমে শিক্ষার্থীরা ফ্রিল্যান্সিং, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ডিজিটাল মার্কেটিং, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং ও ডাটা সায়েন্স বিষয়ে প্রশিক্ষণ পাবে। এসব বিষয়ে পাঠদান নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে প্রশিক্ষক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। তাদের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ১২ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি ৪০ লাখ শিক্ষার্থীকে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে দুই কোটির বেশি গাছ রোপণ সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

.webp)
.webp)
.webp)












.webp)
.webp)

