সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২

প্যারালাইজড ছেলে নিয়ে অসহায় ৮০ বছরের সালেহা বেওয়া, নেই মাথা গোঁজার ঠাঁই

প্যারালাইজড ছেলে নিয়ে অসহায় ৮০ বছরের সালেহা বেওয়া, নেই মাথা গোঁজার ঠাঁই

সংগৃহীত

মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোরআন পড়িয়ে কোনোভাবে সংসার চালিয়েছেন সালেহা বেওয়া। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই সালেহা বেওয়ার এখন নেই নিজের কোনো ঘর, নেই নির্ভর করার মতো আপনজন।

বগুড়া শহরের কর্ণপুর এলাকায় একটি পরিত্যক্ত নির্মাণাধীন ভবনে পলিথিনের ছাউনি দিয়ে প্যারালাইজ ছেলেকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন প্রায় ৮০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধা।

রোববার (১২ এপ্রিল) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পরিত্যক্ত ভবনের এক কোণে অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছেন তিনি। ঘরে নেই পর্যাপ্ত খাবার, নেই প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার সামর্থ্য। অনিরাপদ ওই স্থানে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাকিস্তান আমলেই স্বামী কাজেম শেখকে হারান সালেহা বেওয়া। এরপর মানুষের বাড়িতে কোরআন পড়ানো ও ছোটখাটো কাজ করে দুই ছেলেকে বড় করেন তিনি। দীর্ঘদিন বগুড়ার গোয়ালগাড়ি এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন তারা। বড় ছেলে হানিফ শেখ বিভিন্ন কাজ করে সংসার চালালেও প্রায় দুই বছর আগে তার মৃত্যু হয়। ছোট ছেলে রহিম শেখ কয়েক বছর আগে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে কর্মক্ষমতা হারান। ফলে পরিবারটি চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।

সম্প্রতি তারা যে ভাড়া বাসায় থাকতেন, সেটি মেরামতের অজুহাতে বাড়ির মালিক তাদের বের করে দেন। পরে ছোট ছেলের স্ত্রী অন্যত্র একটি বাসা ভাড়া করে দিলেও খোঁজখবর না নেওয়ায় সেখান থেকেও তাদের চলে যেতে হয়। পরে এলাকাবাসীর সহায়তায় কর্ণপুর উত্তরপাড়া মাজার গেট এলাকায় একটি পরিত্যক্ত নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নেন তারা। তবে ভবনটি খোলা ও অনিরাপদ হওয়ায় সেখানে দীর্ঘদিন থাকা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

প্যারালাইজড ছেলে রহিম শেখ বলেন, আগে ট্রাক-বাসে হেলপারের কাজ করে কোনোভাবে সংসার চলত। অসুস্থ হওয়ার পর এখন ওষুধ কেনার মতো টাকাও নেই। এখানে ১৫ দিন ধরে আছি, আরও কয়েকদিন থাকতে পারব। এরপর কোথায় যাব জানি না। আশপাশের মানুষ খাবার দিলে মা-ছেলে মিলে খাই। সরকার যদি একটি ঘর দিত, তাহলে অন্তত বেঁচে থাকতে পারতাম।

স্থানীয় বাসিন্দা কল্পনা খাতুন বলেন, তারা খুব কষ্টে আছে। আমরা যতটুকু পারি সাহায্য করছি। একটি ঘর পেলে তাদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হতো। অসুস্থ মানুষ বাইরে গেলে আমি হাত ধরে নিয়ে বাইরে যায়, আবার এই ছাঁদের নিচে রেখে আসি।

বর্তমানে এলাকাবাসীর সহানুভূতিতেই কোনোভাবে দিন পার করছেন সালেহা বেওয়া। কেউ খাবার দিচ্ছেন, কেউ গোসল করিয়ে দিচ্ছেন। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত এই বৃদ্ধার নিয়মিত চিকিৎসা বা ওষুধের কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় না খেয়েই দিন কাটাতে হয় তাকে।

এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল ওয়াজেদ বলেন, আমরা বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করব। তবে এখন পর্যন্ত তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি। যোগাযোগ করলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আতাউর রহমান বলেন, তারা যদি কোনো ভাতার আওতায় না থাকে, খোঁজ নিয়ে ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

জীবনের শেষ সময়ে এসে সালেহা বেওয়ার একটাই চাওয়া একটু নিরাপদ আশ্রয় আর দুমুঠো খাবার, যাতে শেষ বয়সটা অন্তত মানবিক মর্যাদায় কাটাতে পারেন।

আব্দুল মোমিন/আরকে

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট