সংগৃহীত
জয়পুরহাটে প্রান্তিক কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি ও টেকসই বিপণনে আলু সংরক্ষণের জন্য নির্মিত অহিমায়িত মডেল ঘরগুলোতে আলু সংরক্ষণ করছেন না কৃষকরা। সরকারের লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঘরগুলোতে কৃষকরা আলু না রেখে কেউ পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন, কেউ বানিয়েছেন গুদাম বা স্টোর রুম ও ব্যবহার করছেন গৃহস্থালির কাজে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই প্রকল্পের মেয়াদ থাকলেও তার আগেই সংশ্লিষ্টদের সঠিক তদারকির অভাবে কৃষকদের কোনো কাজেই আসছে না সরকারের দেওয়া ঘরগুলো। ঘরগুলোকে তদারকি করে কাজে লাগানোর দাবি কৃষকদের।
সারা দেশের মধ্যে আলু উৎপাদনের অন্যতম একটি জেলা জয়পুরহাট। আলুর বহুমুখী ব্যবহার সংরক্ষণ ও বিপণন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জয়পুরহাটে আলু সংরক্ষণের জন্য পাকা পিলারের ওপর বাঁশ, কাঠ ও টিন দিয়ে ৫২টি অহিমায়িত ২৫ ও ১৫ ফিট দৈর্ঘ্য-প্রস্থের মডেল ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি ঘরে ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা করে মোট ১ কোটি ৪৪ লাখ ৪ হাজার টাকা। প্রতিটি ঘরের সঙ্গে ১২০টি ক্যারেট, একটি ডিজিটাল ওজন মাপা মেশিন, এক রোল নেট, একটি ত্রিপল ও একটি স্প্রে মেশিন প্রথম পর্যায়ে ৪০ জনকে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু দেওয়া হয়নি কর্কশিট। পরে ১২টি ঘরে একটি ত্রিপল ছাড়া অন্য সামগ্রীগুলো দেওয়া হয়নি। এসব অহিমায়িত মডেল ঘরে ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ৩০ জন পর্যন্ত কৃষক ২৫ থেকে ৩০ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে কোথাও আলু নেই। ব্যবহার করছেন ব্যক্তিগত ঘর গৃহস্থালির কাজে। কৃষকদের অভিযোগ, অতিরিক্ত গরমে দ্রুত পচে যায় আলু। বৃষ্টির পানি ও ইঁদুরের আক্রমণে আলু সংরক্ষণ করতে পারছেন না তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পের উদ্দেশ্যে হলো আলুচাষিদের উপযুক্ত মূল্য প্রাপ্তিতে সহায়তা প্রদানের গৃহ পর্যায়ে সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আলুর বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি করা এবং টেকসই বিপণন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারের দারিদ্র্য হ্রাসকরণের উদ্দেশ্যেকে ত্বরান্বিত করা। ঘরগুলো দুই-তিন বছর পর সামান্য কিছু রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ১৫ থেকে ২০ বছর ব্যবহারযোগ্য। অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ পরিকল্পনা, নির্মাণগত ত্রুটি, নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ঘর বানানো ও নিয়মিত তদারকির অভাবে এই প্রকল্পটির ঘরগুলো কোনো কাজেই আসছে না কৃষকদের।
সদরের রাংতা গ্রামের কৃষক একাব্বর আলী ও মীর গ্রামের ইয়াহিয়া মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষি বিপণন থেকে আমাদের যে আলুর ঘর দেওয়া হয়েছে, এই ঘরে এখন আলু নেই। আমরা বসবাস করতেছি, রান্না করি, জিনিসপত্র রাখি। আমাদের ঘরের সঙ্গে ১২০টি ক্যারেট, একটি ডিজিটাল ওজন মাপা মেশিন, এক রোল নেট, একটি ত্রিপল ও একটি স্প্রে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঘরের সঙ্গে দিয়েছে শুধু ত্রিপল। অন্য সামগ্রী চাইলে কৃষি বিপণনকে বললে, বলে বরাদ্দ আসেনি। আবার বালু ও বাঁশ নিজের টাকায় কিনেছি, সেই টাকা ঠিকাদারের দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদার সেই টাকাও দেয়নি, মালামালও দেয়নি। এখন তারা ফোনও ধরে না।
আক্কেলপুর উপজেলার রুকিন্দিপুর গভরপুরের সিরাজুল ইসলাম ও সদরের পলিকাদোয়া গ্রামের নুর ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাওয়া ঘরগুলোতে বেশি দিন আলু রাখলে গরমে পচে যায়। প্রথমবার আলু তুলে অনেক টাকা লোকসান হয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে বাতাস হলে পানি ঢোকে। নিচ থেকে ইঁদুর ঢুকে আলু নষ্ট করে। এজন্য আলু রাখা যায় না। বর্তমান ঘরগুলোকে গৃহস্থালির কাজে ও মাছ-মুরগির খাবার, আসবাবপত্র, জ¦ালানি খড়িসহ অন্যান্য জিনিসপত্র রাখি, গুদামঘর হিসেবে ব্যবহার করছি। সরকার যদি তদারকি করে ঘরগুলোকে ভালো করে আলু রাখার মতো পরিবেশ করে দিত, তাহলে ভালো হতো।
জয়পুরহাট জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) রতন কুমার রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, আলুর বহুমুখী ব্যবহার সংরক্ষণ ও বিপণন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জয়পুরহাটে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪০টি ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২টি মোট ৫২টি অহিমায়িত মডেল ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যে ঘরগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলোতে ১২০টি ক্যারেট, একটি ডিজিটাল ওজন মাপা মেশিন, এক রোল নেট, একটি ত্রিপল ও একটি স্প্রে মেশিন দেওয়া হয়েছে। আর পরের অর্থবছরে নির্মিত ১২টি ঘরে ঘরের সঙ্গে শুধু ত্রিপল দেওয়া হয়েছে। অন্যগুলো বরাদ্দ পাইনি, এজন্য দেওয়া হয়নি। আলুর জমিতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার করার কারণে আলু বেশিদিন ঘরগুলোতে সংরক্ষণ করতে পারছেন না কৃষকরা।















