শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

লাইলাতুল কদরের দোয়া

‘লাইলাতুল কদর’ কবে? জেনে নিন আলামতে

‘লাইলাতুল কদর’ কবে? জেনে নিন আলামতে

মর্যাদার রাত ‘শবে কদর’ বা ‘লাইলাতুল কদর’। ‘শবে কদর’ কথাটি ফারসি। শব মানে রাত বা রজনী আর কদর মানে সম্মান, মর্যাদা, গুণাগুণ, সম্ভাবনা, ভাগ্য ইত্যাদি। শবে কদর অর্থ হলো মর্যাদার রাত বা ভাগ্যরজনী। শবে কদরের আরবি হলো লাইলাতুল কদর তথা সম্মানিত রাত। যে রাতে পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছে, সে রাতই লাইলাতুল কদর। পবিত্র রমজান মাসের সবচেয়ে মহিমান্বিত রাত এটি। পবিত্র কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা এ রাতকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলে উল্লেখ করেছেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি মহিমান্বিত লাইলাতুল কদরে। আপনি কি জানেন, সে মহিমাময় রাত্রি কী? মহিমান্বিত ঐ রাত হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাত্রিতে ফেরেশতারা রুহুল কুদুস হজরত জিবরাইল (আ.) এর সঙ্গে অবতরণ করেন; তাদের প্রভু মহান আল্লাহর নির্দেশ ও অনুমতিক্রমে, সব বিষয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে। এই শান্তির ধারা চলতে থাকে ফজর পর্যন্ত’। (সূরা: আল কদর, আয়াত: ১-৫)

কিন্তু এই মহিমান্বিত লাইলাতুল কদর কবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তবে বিভিন্ন হাদিসে এ রাতটি চেনার কিছু আলামতের কথা পাওয়া যায়।

বিশ্বনবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছে। অতঃপর আমাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব, তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে তা তালাশ করো’।

লাইলাতুল কদর বা শবে বরাতের রাত যদি নির্দিষ্ট থাকতো, তাহলে সবাই এ রাতের অপেক্ষায় থাকত, যা শরিয়তসম্মত নয়। তবে অধিকাংশ আলেমদের মতে ২৬ রমজানের দিবাগত রাত অর্থাৎ ২৭ রমজানের রাতই লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

নিশ্চিতভাবে শবে কদরের রাত লাভ করা সৌভাগ্যের বিষয়। কারণ একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন, সেই কাঙ্ক্ষিত রাত কবে আসবে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানের প্রথম ১০ দিন এবং মাঝের ১০ দিন ইতিকাফ করে বললেন, জিব্রাইল (আ.) এসে বলে গেলেন, লাইলাতুল কদর শেষের ১০ দিনে। আমার সঙ্গে যে ইতিকাফ করতে চায়, সে যেন শেষের ১০ দিনে ইতিকাফ করে।

এ হাদিস দ্বারা আমরা নিশ্চিত বুঝতে পারি–রমজানের শেষ ১০ দিনের মধ্যে শবে কদর।

লাইলাতুল কদর চেনার আলামত

বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে লায়লাতুল কদর চেনার কিছু আলামতের কথা পাওয়া গেছে।

(১) এ রাতটি রমজান মাসে। আর এ রাতের ফজিলত কেয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে।

(২) এ রাতটি রমজানের শেষ দশকে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজানের শেষ ১০ দিনে তোমরা কদরের রাত তালাশ কর। (সহিহ বোখারি)

(৩) আর এটি রমজানের বেজোড় রাতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত খোঁজ কর’। (সহিহ বোখারি)

(৪) এ রাত রমজানের শেষ ৭ দিনে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর (কদরের রাত) অন্বেষণ করতে চায়, সে যেন রমজানের শেষ ৭ রাতের মধ্য তা অন্বেষণ করে’।

(৫) রমজানের ২৭ রজনী লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

(ক) হাদিসে আছে, উবাই ইবনে কাব হতে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন যে, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি যতদূর জানি রাসূল (সা.) আমাদেরকে যে রজনীকে কদরের রাত হিসেবে কেয়ামুল্লাইল করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা হলো রমজানের ২৭ তম রাত। (সহিহ মুসলিম)

(খ) আবদুল্লাহ বিন উমার থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কদরের রাত অর্জন করতে ইচ্ছুক, সে যেন তা রমজানের ২৭ রজনীতে অনুসন্ধান করে’। (আহমাদ)

(গ) কদরের রাত হওয়ার ব্যাপারে সম্ভাবনার দিক থেকে পরবর্তী দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো ২৫ তারিখ, তৃতীয় হলো ২৯ তারিখে। চতুর্থ হলো ২১ তারিখ। পঞ্চম হলো ২৩ তারিখের রজনী।

(৬) সর্বশেষ আরেকটি মত হলো- মহিমান্বিত এ রজনীটি স্থানান্তরশীল। অর্থাৎ প্রতি বৎসর একই তারিখে বা একই রজনীতে তা হয় না এবং শুধুমাত্র ২৭ তারিখেই এ রাতটি আসবে তা নির্ধারিত নয়। আল্লাহর হিকমত ও তার ইচ্ছায় কোনো বছর তা ২৫ তারিখে, কোনো বছর ২৩ তারিখে, কোনো বছর ২১ তারিখে, আবার কোনো বছর ২৯ তারিখেও হয়ে থাকে।

(৭) রাতটি গভীর অন্ধকারে ছেয়ে যাবে না।

(৮) নাতিশীতোষ্ণ হবে। অর্থাৎ গরম বা শীতের তীব্রতা থাকবে না।

(৯) মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হতে থাকবে।

(১০) সে রাতে ইবাদত করে মানুষ অপেক্ষাকৃত অধিক তৃপ্তিবোধ করবে।

(১১) কোনো ঈমানদার ব্যক্তিকে আল্লাহ স্বপ্নে হয়তো তা জানিয়েও দিতে পারেন।

(১২) ঐ রাতে বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে।

(১৩) সকালে হালকা আলোকরশ্মিসহ সূর্যোদয় হবে। যা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো। (সহিহ ইবনু খুজাইমা: ২১৯০; বোখারি: ২০২১; মুসলিম: ৭৬২)

লায়লাতুল কদরের আলামত সম্পর্কে নবীজি (সা.) যা বলেছেন

হজরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘...ঐ রাতের আলামত বা লক্ষণ হলো, রাত শেষে সকালে সূর্য উদিত হবে তা উজ্জ্বল হবে। কিন্তু সে সময় (উদয়ের সময়) তার কোনো তীব্র আলোকরশ্মি থাকবে না’। (মুসলিম: ১৬৭০)

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘লাইলাতুল কদরের রাতটি হবে প্রফুল্লময়। না গরম, না ঠাণ্ডা। সেদিন সূর্য উঠবে লালবর্ণে, তবে দুর্বল থাকবে’। (ইবনে খুযাইমা: ২১৯২)

হজরত উবাদা ইবনে সামেত (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, ‘লাইলাতুল কদর শেষ ১০ রজনীতে রয়েছে। যে এই রাতে নিজের (আমলের) হিসাব নিতে দাঁড়াবে, আল্লাহ তাআলা তার পূর্বের এবং পরের পাপরাশি ক্ষমা করে দেবেন। আর কদরের রাত্রি আছে বেজোড় রাত্রিগুলোতে: নবম, সপ্তম, পঞ্চম, তৃতীয় এবং শেষ রাত’।

নবীজি আরো বলেন, ‘লাইলাতুল কদরের আলামত হচ্ছে, স্বচ্ছ রাত, যে রাতে চাঁদ উজ্জ্বল হবে, আবহাওয়ায় প্রশান্তি (সাকিনা) থাকবে। না ঠাণ্ডা, না গরম। সকাল পর্যন্ত (আকাশে) কোনো উল্কাপিণ্ড দেখা যাবে না। সে রাতে চাঁদের মতোই সূর্য উঠবে (তীব্র) আলোকরশ্মি ছাড়া। শয়তান সে সময় বের হয় না’। (মুসনাদ আহমাদ: ২২৭৬৫)

নবীজি (সা) আরো বলেছেন, ‘লাইলাতুল কদর উজ্জ্বল একটি রাত। না গরম, না ঠাণ্ডা। সে রাতে কোনো উল্কাপিণ্ড দেখা যাবে না’। (মাজমাউজ জাওয়ায়িদ: ৩/১৭৯)

লায়লাতুল কদরে করণীয় আমল

(১) মহিমান্বিত এ রজনীর সব নেয়ামত হাসিলের জন্য প্রথমেই শিরকমুক্ত ঈমান পরিশুদ্ধ নিয়ত ও বিদায়াতমুক্ত আমলের মাধ্যমে রাত যাপন করতে হবে।

(২) কদর লাভের আশায় শেষ দশ দিন ইতিকাফ করা।

(৩) বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া। তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া।

(৪) কোরআন তেলাওয়াত করা। দোয়া-দরুদ, দান-সদকা ও তাওবা-ইস্তিগফার করা।

লাইলাতুল কদরের দোয়া

হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম- হে আল্লাহর রাসুল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনি বলে দিন, আমি যদি লাইলাতুল কদর কোন রাতে হবে তা জানতে পারি, তাতে আমি কী (দোয়া) পড়বো?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি বলবে-

اللَّهُمَّ إِنَّكَ عُفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন; তুহিব্বুল আফওয়া; ফাফু আন্নি’।

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল; ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন’। (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, মিশকাত)

সূত্র: নিজেস্ব প্রতিবেদন

সর্বশেষ: