সংগৃহীত
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ভারত। ম্যাচটি হবে মুম্বাইয়ে। আর কলকাতায় প্রথম সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলবে দক্ষিণ আফ্রিকা।
ইডেন গার্ডেন্সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অঘোষিত কোয়ার্টার ফাইনালে ভারত শুরুতে চাপে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত উচ্ছ্বাসে ভেসেছেন স্বাগতিক দর্শকরা। কিন্তু সূর্যকুমার যাদবদের পারফরম্যান্স এবারো প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। সেমিফাইনালে ওঠার পথটা সহজ ছিল না তাদের জন্য। যুক্তরাষ্ট্র, নামিবিয়ার মতো দলের বিপক্ষে স্পিনে ভুগেছে তাদের ব্যাটাররা। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তাদের বোলিং ছিল প্রশ্ন তোলার মতো।
তারপর সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আসল পরীক্ষায় বড় ধাক্কা খায় ভারত। আগামী ৮ মার্চ এই দুই দল ফাইনালে মুখোমুখি হবে, এমনটা ধারণা করা যায়। কিন্তু তার আগে ভারতকে উড়িয়ে দিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নিয়েছে প্রোটিয়ারা। পরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেরা ব্যাটিং করলেও ১৮৪ রান দিয়েছে ভারত। আর গত রোববার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাঁচামরার ম্যাচে সাঞ্জু স্যামসন না দাঁড়ালে কী হতো, সেটা অনুমান করা সহজ!
যাই হোক, ভারত সেমিফাইনালে খেলবে এটাই বাস্তব। কিন্তু বেশ কিছু সমস্যা আছে, যেগুলো তাদের সেমিফাইনাল থেকে বিদায়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কী হয়েছে বরুণ চক্রবর্তীর?
আগের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও চলতি আসরের মধ্যে পূর্ণ সদস্য দেশের বোলারদের মধ্যে বরুণ চক্রবর্তী সবচেয়ে বেশি উইকেট নিয়েছেন। ভারতের সাদা বলের ক্রিকেট দলের নিয়মিত সদস্য হয়ে উঠেছেন এই রহস্য স্পিনার। ভারতের ওয়ানডে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়েও তার ভূমিকা ছিল দারুণ। গৌতম গম্ভীর জেনে গিয়েছিলেন, তার দলে আরও একটি ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ যুক্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে প্রত্যাবর্তনের পর ২৮ ইনিংসে বরুণ উইকেট নিয়েছেন ৫৭টি। প্রতি ১১.২ বলে একটি করে উইকেট! টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে যেন কোনো ব্যাটারই তার বোলিং বুঝতে পারছিল না। কিন্তু বিশ্বমঞ্চে পা রেখে তাকে দিগভ্রান্ত দেখাচ্ছে, যদিও উইকেটখরায় নেই তিনি। গ্রুপ পর্বে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত দলগুলোকে তিনি উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সুপার এইট শুরু হতেই বরুণের সেই ধার কমতে শুরু করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিনি অনেক রান দিয়েছেন। তারপর জিম্বাবুয়ে ও উইন্ডিজের বিপক্ষে তার গড় ইকোনমি রেট ছিল ৯.৩-এর বেশি।
তার আত্মবিশ্বাস যে কমছে, তার প্রমাণ তিনি শর্ট-অফ-লেন্থ ডেলিভারি করছেন। উইন্ডিজের বিপক্ষে সম্ভবত একটি ভালো বলই তিনি করেছিলেন। সেটাই তাকে উইকেট এনে দিয়েছিল। এছাড়া তার নিয়ন্ত্রণেও বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। যার চার ওভারের ওপর ভারত অনেক নির্ভর করতো, তার এমন পারফরম্যান্স দলের জন্য একটি বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।
জাপ্রিত বুমরাহর ওপর অতি-নির্ভরশীলতা
বরুণের ফর্মে ভাটা পড়ায় তা আপনাআপনি জসপ্রিত বুমরাহর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এই ক্রিকেটারকে ছাড়া ভারত কী করতো? বারবার তিনি তার জাদু দেখিয়েছেন। এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তার ৬.৩ ইকোনমি রেট। অবাক করার মতো ব্যাপার। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার যে সব টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ মিলিয়ে তার ইকোনমি রেট ৫.৬৩। মনের মাঝে প্রশ্ন উঠতে পারে— এটি কি সত্যিই সম্ভব?
বুমরাহর ওপর অতি-নির্ভরশীল হওয়াটা কোনো চমক নয়। তাই যেদিন তিনি ফর্মে থাকবেন না সেদিন ভারতের কী হবে! সর্বোপরি, তিনি কোনো মেশিন নন। তিনি রান খরচ করতে পারেন। হতে পারে প্রতিপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে দেখেশুনে খেলছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের ভরসার পাত্র কে হতে পারেন, যখন কি না বরুণও চাপে আছেন?
বুমরাহকে ব্যবহার করা নিয়ে আরেকটি সমস্যা রয়েছে। ২০২৫ সালের এশিয়া কাপের সময় এমনও গেছে, যখন তিনি পাওয়ার-প্লেতেই তিন ওভার বল করেছিলেন। প্রথম ছয় ওভারের মধ্যেই খেলা শেষ করে দেওয়ার একটা তাড়না ছিল। এখন বুমরাহ এমনকি আর্শদীপ সিংয়ের সঙ্গে নতুন বল ভাগাভাগিও করেন না। কাজটি করছেন হার্দিক পান্ডিয়া। মাঝেমধ্যে সূর্যকুমার তার প্রধান অস্ত্রকে পঞ্চম ওভারের আগে ব্যবহারই করছেন না। প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে ভারতের উচিত, তাদের প্রধান পেসারকে সামনে রাখা ও নতুন বলে আর্শদীপের সঙ্গে তাকে আক্রমণ করতে দেওয়া।
ভারতীয় ফিল্ডাররা কি কিছু ধরতে পারবেন?
ম্যাচ শেষে কেউ চাইলে ফিল্ডিং মেডেল নিয়ে উদযাপন করতে পারেন। কেউ বা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে একে অপরকে উৎসাহিত করতে অনুপ্রেরণামূলক কথা বলতে পারেন। কিন্তু মাঠের ভেতর অন্তত সেই বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করা উচিত, যেগুলো নিয়ন্ত্রণযোগ্য। দুর্ভাগ্যবশত, এই ভারতীয় দল মাঠে বাজে পারফর্ম করে নিজেদের অবস্থা আরও খারাপ করে তুলেছে।
তারা হয়তো অনুশীলন মাঠে অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। শরীর নমনীয় রাখতে খেলোয়াড়রা জিমে বাড়তি সময় ব্যয় করতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বল যখন আকাশে ওঠে, তখন আপনার হাত কতটা নিরাপদ সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। সেই কয়েক সেকেন্ডের মুহূর্তে গ্যালারির উন্মাদনা অনুভব করুন তো। তারপর হাতের তালুতে বল নিয়ে উল্লাসের অপেক্ষা করেন। কিন্তু ভারতীয়দের ক্ষেত্রে হাতের তালুগুলো যেন মাখনের মতো হয়ে গেছে।
সুপার এইটের সব দলের মধ্যে ভারতের ক্যাচ ধরার রেকর্ড সবচেয়ে খারাপ। অথচ ফিল্ডিংয়ের মানদণ্ডে প্রায় সবসময় পেছনে থাকে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো দলগুলো। কিন্তু এবার ভারত এক নতুন নিম্নস্তরে পৌঁছেছে। সত্যিই প্রশ্ন উঠছে— একটি তরুণ দল থাকা মানেই কি ভালো ফিল্ডিং ইউনিট?
ভারতের জন্য দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো তাদের লাইনআপে খুব বেশি দক্ষ ফিল্ডার নেই। সবসময় বুমরাহ, আর্শদীপ ও বরুণের মতো খেলোয়াড়দের হটস্পট থেকে দূরে রাখতে হয়। তারপর আছেন ইশান কিষাণ, যিনি মূলত একজন কিপার। শিবম দুবে একজন নিরাপদ ক্যাচার হলেও তার ক্ষিপ্রতায় ঘাটতি রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলেন অভিষেক শর্মা। যতগুলো ক্যাচ মিস করা উচিত নয়, তিনি তাই করেছেন।
সেমিফাইনাল ও ফাইনালগুলো সেই সব ‘কী হতে পারতো’ মুহূর্তের শিরোনাম হওয়ার জন্য পরিচিত। ভারত নিশ্চয় তাদের দুর্বল ফিল্ডিংয়ের কারণে পরাজিতের তালিকায় থাকতে চাইবে না।
ব্যক্তিগত নৈপুণ্য সব ম্যাচ জেতাতে পারে না
যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে সূর্যকুমার যাদব। পাকিস্তানের বিপক্ষে ইশান কিষাণ। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শিবম দুবে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বুমরাহ এবং সবশেষ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সঞ্জু স্যামসন। এই পুরো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে চড়েই পার পেয়েছে। ভাগ্যের এই জোরে হয়তো অনেক দূরে যাওয়া যায়, কিন্তু সাধারণত এই কারণে টুর্নামেন্টও হারা লাগতে পারে। শুধু অস্ট্রেলিয়ার দিকেই তাকালে বোঝা যাবে সেই কথা। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের শেষার্ধে তাদের পুরো দলের একসাথে জ্বলে ওঠার খুব প্রয়োজন ছিল।
গল্পের খাতিরে শুনতে ভালো লাগে যে, ভারতের প্রত্যেক ম্যাচে একজন করে খেলোয়াড় পারফর্ম করার জন্য হাত বাড়ায়। কিন্তু টি-টোয়েন্টিতে তারকা ব্যাটারে ঠাসা একটি শক্তিশালী দলে কেন মাত্র একজন ব্যক্তির এগিয়ে আসার প্রয়োজন হবে? মূল সমস্যা কোথায়? ভারতের প্রথম চার ব্যাটারের ধারাবাহিকতার অভাব। জিম্বাবুয়ে ম্যাচ ছাড়া তারা মোটেও একসাথে জ্বলে উঠতে পারেননি। মুম্বাই ও আহমেদাবাদের মতো মাঠে ভারতের আরও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন হবে।
সূর্যকুমার যাদবের আকাশ এখনও অনেক দূরে
সূর্যকুমার যাদব একটি অবিশ্বাস্য ইনিংস দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিলেন। আমেরিকার বিপক্ষে ভারত খাদের কিনারায় ছিল, যারা ভারতকে ৭৭/৬-এ নামিয়ে এনেছিল। স্থানীয় ছেলেটি যখন ৪৯ বলে ৮৪ রানের জাদুকরী ইনিংস খেলে দলকে উদ্ধার করেন, তখন পুরো ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই ইনিংসের পর কী হলো?
তার পরের ৬টি ইনিংসের মধ্যে ৫টিতে সূর্যকুমারের স্ট্রাইক রেট ছিল ৯২, ১১০, ১২১, ৮১ এবং ১১২। একমাত্র জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৩ বলে ৩৩ রানের ইনিংসেই তিনি তার আসল রূপ দেখিয়েছিলেন। সেই ইনিংস সত্ত্বেও এই টুর্নামেন্টে তার সামগ্রিক স্ট্রাইক রেট ১৩৫.৯। তিনি কি সেই একই মানুষ যিনি ২০২৫ সালের আইপিএলে ১৬৮ স্ট্রাইক রেটে ৭১৭ রান করেছিলেন?
দলগুলো সূর্যকুমারকে স্পিন দিয়ে আটকে দিচ্ছে। তিনি স্লোয়ার বলের বিরুদ্ধে টাইমিং খুঁজে পেতে লড়াই করছেন, বিশেষ করে বাঁহাতি স্পিনারদের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, তিনি শুরুটাও ধীরগতিতে করছেন, প্রথম দশ বলে তার স্ট্রাইক রেট মাত্র ১১৮। তার মতে, তিনি ফর্মে বাইরে হয়তো নেই। সেটি সত্য হতে পারে তবে তার সেই চেনা ছন্দ কমে গেছে। তার সেরা সময় হয়তো পেরিয়ে গেছে, কিন্তু তিনি যে ধরনের প্রতিভা, সূর্যকুমার এখনও একজন ম্যাচ-উইনার হতে পারেন।
কেউ তার মতো ফাঁক খুঁজে বল পাঠাতে পারে না। এটাই তার এক্স-ফ্যাক্টর। কিন্তু প্রতিপক্ষ এখন বুঝে গেছে যে, যদি আপনি স্টাম্পের পেছনের ফ্লিক শটটি আটকে দিতে পারেন, তবে সূর্যকুমার সীমিত হয়ে পড়বেন।
আসল অভিষেক শর্মা কোথায়?
এখন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় চমক— অভিষেক শর্মা। টুর্নামেন্টে আসার আগে অভিষেক ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে। এখন তিনি যে ধরনের পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, আগে কখনো এমন হয়নি। টুর্নামেন্টে আসার আগে ২৪টি ম্যাচের এক সময়ে তিনি প্রায় ২০০ স্ট্রাইক রেটে এবং ৪৫ গড়ে ১০২৯ রান করেছিলেন।
তার শেষ ৮টি ম্যাচের পরিসংখ্যান কী হতে পারে ধারণা করুন? তিনি মাত্র ১১০ রান করেছেন এবং গড় মাত্র ১৩.৭৫। সেই তালিকায় ৪টি ডাক (শূন্য রান) রয়েছে, যার মধ্যে তিনটি এসেছে চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শুরুতে।
গড়ের সূত্র নিশ্চিতভাবেই অভিষেককে বেঁধে ফেলেছে। তিনি মনের আনন্দে রান করছিলেন আর এখন একটি মাত্র বাউন্ডারি আসাও স্বস্তির চিহ্ন হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তাকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসহীন দেখাচ্ছে। প্রতিপক্ষ তার স্টাম্প বরাবর বল করা শুরু করেছে, যার ফলে অভিষেক হাত খুলে ব্যাট করার সুযোগ পাচ্ছেন না। উইন্ডিজের বিপক্ষে তিনি একটি বাজে বলে আউট হন। বাঁহাতি স্পিনার আকিল হোসেন একটি শর্ট লেংথের বল করেছিলেন এবং অভিষেক সেটি আকাশে তুলে দেন।
সৌভাগ্যবশত, তার সাথে কোনো টেকনিক্যাল সমস্যা নেই। এটি সম্পূর্ণ মানসিক। আর সেটি কয়েক বলের মধ্যেই ঠিক হয়ে যেতে পারে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তার একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ফিফটি ছিল কিন্তু তিনি সেটিকে আরেকটি আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর মতো ইনিংসে রূপ দিতে পারেননি। সম্ভবত ক্যারিবীয় দলের বিপক্ষে ড্রপ হওয়া ক্যাচগুলো তার মনে কাজ করছিল।’
এফএইচএম/
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট
.jpg)



.jpg)














