সংগৃহীত
চারদিকে নদী আর খাল। অদূরে বঙ্গোপসাগর। এর মাঝখানেই ছোট্ট এক টুকরো দ্বীপ। সবাই চেনেন করিয়ারদিয়া গ্রাম নামে। তবে এখানে ভোগান্তির কোনো শেষ নেই। প্রায় আড়াই হাজার লোকের বসবাসের এ গ্রামটিতে নেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উচ্চবিদ্যালয়সহ নানা নাগরিক সুবিধা।
করিয়ারদিয়া দ্বীপটির অবস্থান কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়নে। এতে বসবাস করেন ২ হাজার ৫৩০ জন মানুষ। ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ৩৯৮ জন। সারা দেশের মতো এ গ্রামের মানুষেরও ভোট নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। তবে গতকাল শনিবার পর্যন্ত এ গ্রামে কোনো প্রার্থী যাননি।
সম্প্রতি ভোটের প্রচার দেখতে সেখানে যান প্রতিবেদক। দ্বীপটির উত্তরে উজানটিয়া, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের মোহনা, দক্ষিণে মহেশখালীর মাতারবাড়ী, পূর্বে বদরখালী। পেকুয়া বাজার থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় প্রথমে উজানটিয়া হুয়াইক্কা বাজারে যেতে হয়। এরপর খাল পার হওয়ার জন্য উঠতে হয় নৌকায়। নৌকা থেকে নেমে কাদা মাড়িয়ে এর মূল ভূখণ্ডে যেতে হয়।
সড়কে উঠেই কথা হয় অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ জাহেদের (২৫) সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত বড় একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। অথচ কোনো প্রার্থী খবর নিতে দ্বীপে আসেননি। আমাদের সমস্যার কথা শোনেননি। এবার নির্বাচনের কোনো আমেজও চোখে পড়ছে না। আগেরবার গাড়িতে মাইক বেঁধে প্রচার হতো। এবার কিছুই নেই।’
ব্যানার আছে, প্রার্থী নেই
সরেজমিনে দেখা গেছে, আলিয়াদিয়ার ফকিরাঘোনা এলাকায় বিএনপির প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ ও জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল ফারুকের কয়েকটি ব্যানার ঝুলছে। এর বাইরে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ছরওয়ার আলম কুতুবীর কোনো ব্যানার বা ফেস্টুনও দেখা যায়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
প্রার্থী না আসার আক্ষেপ রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। জানতে চাইলে ফকিরাঘোনার বাসিন্দা জাকের উল্লাহ (৪৬) বলেন, ‘আমরা দ্বীপের মানুষ। তাই কেউ আমাদের ভোটার হিসেবে গোনে না।’
করিয়ারদিয়া এলাকাটি পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ড। এই এলাকার ইউপি সদস্য জাফর আলম বলেন, ‘কোনো প্রার্থী আসতে না পারলেও এখানে তাঁদের প্রতিনিধিরা এসেছেন। তাঁরা সমস্যার কথা শুনেছেন। আমাদের মূল সমস্যা সেতু। একটি সেতু করে দিলে সব সমস্যা সহজেই সমাধান হয়ে যাবে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুরো দ্বীপটিতে চলাচলের জন্য রয়েছে মাত্র তিনটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। তবে কোনো পাকা রাস্তা নেই। কিছু জায়গায় ইট বিছানো সড়ক থাকলেও তা ভাঙাচোরা। কোনো প্রার্থী এলে বাসিন্দারা মূলত ভোটের বিনিময়ে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক সংস্কারের কথা বলতেন।
১০ থেকে ১২ দিন আগে পেকুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শাফায়েত আজিজ বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইতে দ্বীপে এসেছিলেন। তাঁকে সমস্যার কথা জানিয়েছেন বাসিন্দারা। জানতে চাইলে শাফায়েত আজিজ বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচিত হলে হুয়াইক্কা মার্কেট থেকে করিয়ারদিয়া সেতু হয়ে যাবে। সেটি আমরা সালাহউদ্দিন আহমদের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।’
গ্রামটির ফকিরাঘোনা এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক (৪৫) প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলে দ্বীপের মানুষেরা সহজে প্রাথমিক চিকিৎসা পেত। একটি একটি প্যারাসিটামল প্রয়োজন হলেও নৌকায় চড়ে ওপারে যেতে হয়।’
গ্রামটির একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করিয়ারদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এতে শিক্ষার্থী রয়েছে ১১৫ জন। দুই পালায় এই বিদ্যালয়ে তিনজন শিক্ষক পড়ান। বিদ্যালয়ের একমাত্র ভবনটি তিন বছর ধরে পরিত্যক্ত। এই পরিত্যক্ত ভবনেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পাঠদান চলছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হামিদ হোছাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘করিয়ারদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭০ সালে। ৯১–এর ঘূর্ণিঝড়ের পর ১৯৯৪ সালে সৌদি অর্থায়নে সাইক্লোন শেল্টার কাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি নির্মিত হয়। খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাওয়ায় ২০২৩ সালে উপজেলা প্রশাসন ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। কিন্তু আর কোনো ভবন না থাকায় সেই পরিত্যক্ত ভবনেই পাঠদান চলছে।’
সূত্র: প্রথম আলো
















