সংগৃহীত
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় পঞ্চমবারের মতো ফুটতে শুরু করেছে রাজসিক সৌন্দর্যের ফুল টিউলিপ। ছড়াতে শুরু করেছে মুগ্ধতা। এই ফুল দেখতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
তেঁতুলিয়া উপজেলার ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা দর্জিপাড়া এলাকায় নারী উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে খামার পর্যায়ে করা হয়েছে শীতের দেশের ফুল টিউলিপের চাষ। এবারও টিউলিপ উৎপাদনের এ উদ্যোগ নিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)।
গত শুক্রবার বিকেলে দর্শনার্থীদের জন্য এই টিউলিপবাগান উন্মুক্ত করা হয়েছে। এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ইএসডিওর পরিচালক (প্রশাসন) সেলিমা আখতার। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ইএসডিওর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ শহীদ উজ জামান ও সংস্থাটির ইয়ুথ এনগেজমেন্ট অ্যান্ড আইসিটির টিম লিডার শাশ্বত জামান।

টিউলিপ ফুল দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছেন দর্শনার্থীরা। গত শুক্রবার বিকেলে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার দর্জিপাড়া এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো
ইএসডিও জানায়, ক্ষুদ্র চাষি উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা, তাদের পরিবারের আয় বাড়ানো, বিদেশ থেকে টিউলিপ ফুল আমদানি কমানো, পঞ্চগড় জেলাকে পর্যটন উপযোগী করে গড়ে তোলা ও ইকো-কমিউনিটি ট্যুরিজমের সম্ভাবনাকে আরও সুদৃঢ় করাই এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।
শুক্রবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, সূর্যের আলো আর তাপ নিয়ন্ত্রণ করা বিশেষ শেডের নিচে সারি সারি পাঁচ প্রজাতির অন্তত সাড়ে ১২ হাজার টিউলিপ ফুলের গাছ। এর মধ্যে লালিবেলা (লাল) ও মিস্টিক ভ্যান ইজক (গোলাপি) প্রজাতির টিউলিপ ফুটতে শুরু করেছে। দর্শনার্থীরা জনপ্রতি ৫০ টাকার টিকিট কেটে বাগানে ঢুকে উপভোগ করছেন টিউলিপের সৌন্দর্য। এ বাগানে এসে কেউ ফুলগুলো ছুঁয়ে দেখছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ফুলের সঙ্গে সেলফি নিচ্ছেন। আবার কেউ ভিডিও কলে দূরে থাকা স্বজনদের দেখাচ্ছেন টিউলিপের সৌন্দর্য।
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শীতপ্রধান দেশে টিউলিপ ফুল দেখা যায়। কিন্তু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে এই ফুলের দেখা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। টিউলিপ চাষের ক্ষেত্রে দিনের বেলা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও রাতে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহনশীল। এর চেয়ে বেশি তাপমাত্রা হলে গাছ পূর্ণবয়স্ক হওয়ার আগে মানসম্মত ফুল না–ও ফুটতে পারে। স্বাভাবিকভাবে রোপণের ১৮ থেকে ২০ দিনের মধ্যে কলি আসতে শুরু করে এবং ২৫ থেকে ৬০ দিন পর্যন্ত টিউলিপ ফুল স্থায়ী হয়। অনেক সময় আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে এর ব্যতিক্রমও হতে পারে।

পুরোপুরি টিউলিপ ফুল ফুটলে দর্শনার্থীদের দেখার পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে এসব ফুল বিক্রিও করা হবে
ছবি: প্রথম আলো
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এবারও শীতপ্রধান এলাকা হিসেবে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলাকে নির্বাচন করেছে ইএসডিও। গত ১৫ জানুয়ারি উপজেলার দর্জিপাড়া গ্রামের পাঁচজন নারী উদ্যোক্তা চাষির মাধ্যমে সম্প্রতি নেদারল্যান্ডস থেকে আনা টিউলিপ গাছের বাল্ব (বীজ হিসেবে ব্যবহৃত রূপান্তরিত কাণ্ড) রোপণ করা হয়। মোট ৬০ শতাংশ জমিতে ৫ প্রজাতির সাড়ে ১২ হাজার টিউলিপের বাল্ব রোপণ করা হয়। এই ফুল ফোটাতে ব্যবহার করা হয়েছে উচ্চ কৃষিপ্রযুক্তি। ফুলগুলো একটি বিশেষ শেডের (ছাউনির) নিচে চাষ করা হচ্ছে। নেট দিয়ে চারপাশ ঘিরে দেওয়া হয়েছে, যা তাপনিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করে সূর্যের আলো। পুরোপুরি টিউলিপ ফুল ফুটলে দর্শনার্থীদের দেখার পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে এসব ফুল বিক্রিও করা হবে বলে জানা গেছে।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে টিউলিপ দেখতে সৈয়দপুর থেকে এসেছেন কলেজছাত্রী সায়েস্তা খাতুন। তিনি বলেন, ‘আমরা তেঁতুলিয়ায় বেড়াতে এসেছিলাম। এখানে এসে শুনলাম, টিউলিপ ফুটেছে। সুযোগটা হাতছাড়া না করে সবাই মিলে দেখতে এলাম। এর আগে কোনো দিন টিউলিপ এভাবে সরাসরি দেখিনি। টিউলিপ ছুঁয়ে দেখতে পেরে সত্যিই আমি অভিভূত।’

টিউলিপের বাগানে এসে কেউ ছুঁয়ে দেখছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ফুলের সঙ্গে সেলফি নিচ্ছেন
ছবি: প্রথম আলো
বগুড়া থেকে আসা স্কুলশিক্ষক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘স্ত্রী–সন্তানদের নিয়ে তেঁতুলিয়া বেড়াতে এসে টিউলিপ দেখার নতুন অভিজ্ঞতা হলো। বিদেশি এই ফুলের নাম শুনেছি অনেক, কিন্তু এভাবে কাছ থেকে কখনো দেখিনি।’
ইএসডিওর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ শহীদ উজ জামান বলেন, এবার পঞ্চমবারের মতো চাষিরা টিউলিপ ফুল ফুটিয়েছেন। তেঁতুলিয়ায় পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পাঁচ বছর আগে প্রান্তিক নারীদের সঙ্গে নিয়ে টিউলিপ ফুল উৎপাদন শুরু করা হয়। টিউলিপের কারণে তেঁতুলিয়ায় অনেক পর্যটক আসেন, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয় ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এই অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে তেঁতুলিয়ায় ইকো-কমিউনিটি ট্যুরিজম গড়ে তোলা হচ্ছে।
২০২২ সালে তেঁতুলিয়ায় প্রথমবারের মতো পাইলট প্রকল্প হিসেবে উপজেলার শারিয়ালজোত ও দর্জিপাড়া গ্রামের আটজন নারী উদ্যোক্তা চাষির মাধ্যমে ৪০ শতাংশ জমিতে ৬ প্রজাতির ৪০ হাজার টিউলিপ ফুল চাষ শুরু করেছিল ইএসডিও।
সূত্র: প্রথম আলো















