রোববার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মিরপুরে নুরজাহান বেগমের মৃত্যু ও আমাদের দায়

মিরপুরে নুরজাহান বেগমের মৃত্যু ও আমাদের দায়

সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার মিরপুরের ঘটনাটা কি আমাদের নাড়িয়ে দিয়ে গেল? আমরা কি খানিক বিস্মিত হলাম? চমকে উঠলাম? ঘটনার নির্মমতা উপলব্ধি করার চেষ্টা করলাম? ব্যথিত হলাম? অনেকগুলো প্রশ্ন কিন্তু বিপরীতে উত্তর বোধ হয় একটাই-না, আমরা আলোড়িত হইনি, আকাশে গোলাপী চাঁদ দেখে যতটা হই আজকাল।

একা ঘরে বৃদ্ধ মা নুরজাহান বেগমের অর্ধগলিত মৃতদেহ উদ্ধারের পরেও আমাদের নাগরিক জীবন প্রবাহের সবকিছু ভীষণ ভাবে স্বাভাবিক হয়েই আছে, থাকবেও।

এরপরেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামানুসারে নাম রাখা ষাঁড়টির চিড়িয়াখানার জীবনের খবর আমাদের আগ্রহের জায়গা দখল করবে, রাজনীতির মাঠে কুৎসা রচনা করে চরিত্র হননের কাহিনি আমাদের প্রাতরাশের টেবিলে এক কাপ কফিকে আরও চনমনে করে তুলবে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোনো তারকা খচিত হোটেলের বল রুমে এ জাতির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দারুণ ধারালো আলোচনা চলবে; গণমাধ্যম কর্মীদের মুখস্থ প্রশ্নে উদ্দীপ্ত হবেন উদ্যোক্তারা, ক্যামেরার সামনে নিজেকে আরেকটু সময় উপস্থাপনের জন্য মৃদু ধাক্কাধাক্কি হবে, বাজারে সবজির মূল্য নিয়ে বিতর্ক হবে, ফুটবল ম্যাচে সাডেন ডেথের মুখোমুখি সব শান্ত হয়ে থাকবে, পরমুহূর্তে ফেটে পড়বে উল্লাসে। শুধু মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের সেই ঘরে পঁচাত্তর বছর বয়সী নুরজাহান বেগম আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না।

একটি বাড়ির নোংরা, অপরিচ্ছন্ন দরজা বন্ধ ঘরে নিঃশব্দ মৃত্যু ঘটে যাওয়ার পরেও দীর্ঘদিন পড়েছিল তার মৃতদেহ। সন্তানদের কেউ খোঁজ নিতেও আসেনি তাদের মায়ের। ঘরের জানালা-কপাট বন্ধ ছিল বলে মৃতদেহে পচনের গন্ধ বাইরে আসতে পারেনি।

তার সন্তানদের মধ্যে একজন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, একজন সরকারের যুগ্ম সচিব আর অপরজন কানাডা প্রবাসী। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, হতভাগ্য নুরজাহান বেগম তার মেয়ের বাসায় থাকতেন একটি আলাদা ঘরে। ঘরটি অত্যন্ত অগোছালো এবং আবর্জনায় ভর্তি ছিল। মায়ের মৃত্যুর খবরটি একই ছাদের তলায় তার কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।

আধুনিক ভোগবাদী সমাজে নির্বিকার হয়ে থাকাই বাঁচার মন্ত্র। যেখানে পাশের ঘরে জন্মদাত্রী জননী মরে গেলে, তার মৃত শরীর কয়েকদিন ধরে একা বদ্ধ ঘরে পড়ে থাকলেও উদাসীন অবসর বিনোদনের জন্য সিনেপ্লেক্সে দলবেঁধে যাওয়াটাই নতুন কালচার; আমাদের বিচ্ছিন্নতার ভবিষ্যৎ।

কী হয়েছিল নুরজাহান বেগমের? তিনি কি অসুস্থ ছিলেন? সন্তানরা তার কোনো খোঁজ নেয়নি কেন? তাকে যথাযথ খাবার দেয়নি তার কন্যাসন্তানটি? এই প্রশ্নগুলোও এক বোবা নীরবতার মাঝে ডুবে গেছে। ডুবে গেছে আমাদের নিস্পৃহ মনও। 

বরফের চেয়েও ঠান্ডা হয়ে যাওয়া মানসিক প্রতিক্রিয়াকে মাটির নিচে পুঁতে ফেলে আমরা দিব্যি স্বাভাবিক জীবনযাপন করছি। কী বলা যায় এই ঘটনাটিকে, মৃত্যু নাকি হত্যাকাণ্ড? প্রতিদিন অবহেলা আর উপেক্ষার ধারালো হলুদ নখ একটু একটু করে উপড়ে নিয়েছে একজন মানুষের জীবন। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা একটি পুরনো কুয়া থেকে তুলে এনেছি বোধের মৃতদেহ। আয়নায় মুখ দেখতে গিয়ে দেখছি নিজের আত্মকেন্দ্রীক, নিঃসঙ্গ মুখ।

এই দেশে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে ধারাবাহিকভাবে। দুর্নীতি শাসিত মানসিকতা ব্যক্তিকে উসকে দিয়েছে অনুপার্জিত বিত্ত সঞ্চয় করার জন্য। তৈরি হয়েছে লোভ, স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এই আকাঙ্ক্ষা মানুষের বিচার-বিবেচনা লুপ্ত করে দেয়।

চাওয়া এবং পাওয়ার ব্যারোমিটারে পারদ ক্রমশ উপরে উঠতে থাকে। প্রাচীন কুয়া থেকে আমরাই তুলে আনি বোধের মৃতদেহ। আকাঙ্ক্ষার সীমা নির্ধারণ করতে কখনোই শেখায় না ভোগবাদী সমাজ। এই সমাজব্যবস্থার কাজই হচ্ছে ব্যক্তির চাওয়াকে ক্রমশ একটি দিগন্ত থেকে আরেকটি দিগন্তের দিকে নিয়ে যাওয়া।

একটা ছোট ফাঁদকে ছড়িয়ে দিয়ে আরও বড় ফাঁদের ভেতরে সব মানুষকে জড়িয়ে ফেলা। কেউ তখন নিজের দিকে তাকায় না। আয়নায় প্রতিদিন দাড়ি কাটা অথবা ব্রাশ করার সময় হয়তো তার কাছে নিজের চেহারাটাই ছায়াচ্ছন্ন হয়ে থাকে। নিজেকেই যে নিজে চিনতে ব্যর্থ হচ্ছি সেটুকু অনুভব করার বোধও লুপ্ত হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। শুধু নিজের জন্য বেঁচে থাকাই এখন একবিংশ শতাব্দীর জনপ্রিয় শ্লোগান।

সামাজিক অনিরাপত্তা, দুর্নীতি আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা মানুষের আত্মাকে ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রিক আর স্বার্থশাসিত করে তোলে। হারিয়ে যায় মূল্যবোধ। যে রাতারাতি প্রভূত বিত্তের মালিক বনে যাচ্ছে, যেকোনো ধরনের দুর্নীতির সহায়ক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে তার কাছে এখন মূল্যবোধ বিষয়টা আপেক্ষিক।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, আমরা মূল্যবোধের জামাটা পাল্টে নিলাম কেন? আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি চর্চা গত কয়েক দশকে কোথায় হাওয়া হয়ে গেল? পঞ্চাশ, ষাট অথবা সত্তরের দশকে একটি শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা বাঙালিরা দেখেছিল।

মুক্ত চিন্তা, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম আর মানবিক সমাজ গঠনের জন্য দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সমাজ বাস্তবতা, সমাজতান্ত্রিক চেতনার উত্থান আর উদার সংস্কৃতি চর্চার ঢেউ এই দেশের সমাজেও ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির এককেন্দ্রিক বিস্তার নব্বইয়ের দশকের পর থেকে মানুষের ভাবনাকে জমা করে দিল ভোগবাদের কাছে।

মানুষ এখন একা বাঁচতে চায়। নিজেকে নিজের স্বার্থের কাছে জলাঞ্জলি দিতে চায়। ভীষণ মূল্যবান এই স্বার্থ তার কাছে। সন্তানকেও সে শিক্ষা দিচ্ছে স্বার্থের দাসত্ব গ্রহণ করতে।

ব্যক্তিগত লাভ, নিরাপত্তা অর্জন এবং নিজেকেই নিজের ভেতরে বন্দি করে রাখার মন্ত্র মানুষের মানবিকতাকে মৃত ঘোষণা করলো। মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠল। সেখানে বায়ু ভর্তি রঙিন চিপসের ঠোঙার মতো অর্ধেকটাই যে হাওয়াতে ঠাসা তা বোঝার ক্ষমতা কারো রইল না।

আধুনিক ভোগবাদী সমাজে নির্বিকার হয়ে থাকাই বাঁচার মন্ত্র। যেখানে পাশের ঘরে জন্মদাত্রী জননী মরে গেলে, তার মৃত শরীর কয়েকদিন ধরে একা বদ্ধ ঘরে পড়ে থাকলেও উদাসীন অবসর বিনোদনের জন্য সিনেপ্লেক্সে দলবেঁধে যাওয়াটাই নতুন কালচার; আমাদের বিচ্ছিন্নতার ভবিষ্যৎ।

মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বাঁচে। সমাজগঠনে তার এই ইতিহাস বহু পুরোনো। কিন্তু এখন আমরা বোধ হয় খুন হওয়া ইতিহাসের মৃতদেহ কাঁধে বয়ে নিয়ে চলেছি। মানুষ এখন একা বাঁচতে চায়। নিজেকে নিজের স্বার্থের কাছে জলাঞ্জলি দিতে চায়। ভীষণ মূল্যবান এই স্বার্থ তার কাছে। সন্তানকেও সে শিক্ষা দিচ্ছে স্বার্থের দাসত্ব গ্রহণ করতে।

একান্ত নিজের চৌহদ্দির বাইরে কিছুই তার আপন নয়-এই শিক্ষায় সশস্ত্র করছে সন্তানকে। ফলে বোধহীন একটি প্রজন্ম গড়ে উঠেছে বিগত কয়েক দশকে, যারা নিজেকে ছাড়া অন্য কিছু আপন ভাবতে ব্যর্থ হয়েছে। তারই ভয়ংকর পরিণতি নুরজাহান বেগমের মৃত্যু।

এই একটি মৃত্যু আমাদের প্রতিক্রিয়াহীন মুখগুলোকে ভীত করে তুলতে পারত, চিন্তার স্রোতকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পারত। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। আর দশটা খুন, ধর্ষণ, অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবরের মিছিলে নুরজাহান বেগমের খবরটাও এখন সংবাদপত্রের ভাষায় ‘ডেড স্টোরি’।

আমরা আমাদের বিচ্ছিন্নতার ভবিষ্যৎ বুনে চলেছি। যেখানে মানুষ একা। একসঙ্গে থেকেও ভীষণ অচেনা ও একা। আমরা তাকাতে ভুলে গেছি, ভাবতে ভুলে গেছি, থামতে ভুলে গেছি। এক বোধহীন চেতনার বিস্তার সমাজকে গ্রাস করেছে। আমরা ফিরেও তাকাই না। আমাদের এই নিঃসঙ্গ নির্মাণ সমাজকে কোথায় নিয়ে চলেছে তা এখন আর্তনাদের মতো শোনায়।

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

জনপ্রিয়

সর্বশেষ:

শিরোনাম: