সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ঈদে বাড়িতে যেতেই হবে?

ঈদে বাড়িতে যেতেই হবে?

সংগৃহীত

ঈদ যত কাছে আসে ঢাকার চেহারা তত বদলাতে থাকে। ব্যস্ত রাস্তাগুলোতেও তখন অন্যরকম এক অস্থিরতা দেখা যায়। অফিস শেষে মানুষের চোখে ক্লান্তির সঙ্গে মিশে থাকে বাড়ি ফেরার অপেক্ষা। কেউ টিকিটের খোঁজ করছেন। কেউ ব্যাগ গোছাচ্ছেন। কেউ ফোন করে মাকে বলছেন, “কাল রওনা দেবো।” এই শহরে লাখো মানুষ থাকেন শুধু জীবিকার জন্য। কেউ চাকরি করেন। কেউ ব্যবসা। কেউ পড়াশোনা। কেউ দিনমজুর। কিন্তু তাদের বেশির ভাগের শেকড় পড়ে আছে গ্রামের মাটিতে। আর তাই ঈদ এলেই বুকের ভেতর একটা ডাক ওঠে- বাড়ি যেতে হবে। এটা আজকের গল্প নয়। বহু যুগ ধরেই এই দেশে ঈদ মানে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা। 

সারা বছরের না-পাওয়া সময়

অনেকেরই বছরে একবারও বাড়ি যাওয়া হয় না। ছুটি মেলে না। কাজের চাপ থাকে। সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে নিজের ইচ্ছাগুলো চাপা পড়ে যায়। ফোনে কথা হয় ঠিকই। কিন্তু ফোনে কি বাবার পাশে বসে চা খাওয়া যায়? ছোট ভাইটার মাথায় হাত রাখা যায়? বাড়ির উঠানের গন্ধ কি ফোনের ওপাশ থেকে অনুভব করা যায়? ঈদ সেই সুযোগ এনে দেয়। এই কয়েক দিনের ছুটিতে বাড়ির সবাই একসঙ্গে হয়। দূরের আত্মীয় আসেন। পুরোনো বন্ধুরা জড়ো হয়। গ্রামের রাস্তাগুলো আবার চেনা মুখে ভরে ওঠে। এক অর্থে ঈদ হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় পারিবারিক পুনর্মিলনী।

মায়ের অপেক্ষা

ঈদের আগে বাংলাদেশের অসংখ্য মা একই প্রশ্ন করেন, “কবে আসবি?” এই একটি প্রশ্নের ভেতরে কত আবেগ জমে থাকে তা শুধু দূরে থাকা সন্তানেরাই বোঝেন। কেউ অফিসের ব্যস্ততায় ডুবে থাকেন। কেউ জীবনের হিসাব মেলাতে মেলাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু ঈদের আগে মায়ের কণ্ঠ শুনলেই বুকের ভেতরটা হঠাৎ নরম হয়ে যায়। তখন বাসের ভিড়ও সহ্য হয়। দীর্ঘ যানজটও তেমন বড় মনে হয় না। কারণ বাড়িতে একজন মা অপেক্ষা করছেন। হয়তো রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছেলের প্রিয় খাবার রান্না করছেন। হয়তো বারবার ফোন হাতে নিয়ে খবর নিচ্ছেন টিকিট পেয়েছে কি না। আবার অনেক মানুষ আছেন যাদের মা আর নেই। ঈদ এলেই তাদের বুকের ভেতর অন্যরকম শূন্যতা জেগে ওঠে। বাড়িতে ফিরলেও সেই পরিচিত ডাক আর শোনা যায় না। রান্নাঘরে গিয়ে আর দেখা যায় না ব্যস্ত এক মুখ। ঈদের নতুন জামা দেখিয়ে আর কেউ বলেন না, “তোকে খুব সুন্দর লাগছে।” তবু তারা বাড়ি যান। কারণ বাড়ির প্রতিটি কোণজুড়ে তখনও মায়ের স্মৃতি লেগে থাকে। মায়ের না-থাকাও তখন বাড়িতে ফেরার এক গভীর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাড়ি কি কেবলই বাড়ি?

বাড়ি মানে শুধু টিনের ঘর বা দালান নয়। বাড়ি মানে পরিচিত গন্ধ। পরিচিত মানুষ। পরিচিত ডাক। অনেকেই বলেন শহরে সব আছে। ভালো খাবার আছে। আলো আছে। বড় বড় ভবন আছে। কিন্তু শান্তি নেই। গ্রামের বাড়িতে গেলে মানুষ যেন আবার নিজেকে খুঁজে পান। ঈদের সকালে পুরনো মসজিদে নামাজ পড়া। নামাজ শেষে সবার সঙ্গে কোলাকুলি। দুপুরে একসঙ্গে খাওয়া। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই মানুষকে ভেতর থেকে নরম করে দেয়। 

পুরনো বন্ধুদের পুনর্মিলনী

ঈদের আরেকটি বড় আনন্দ লুকিয়ে থাকে পুরোনো বন্ধুদের আড্ডায়। স্কুলজীবনের যেসব বন্ধু একসময় প্রতিদিন দেখা হতো এখন তাদের অনেকেই দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে আছেন। কেউ চাকরি করেন। কেউ ব্যবসা। কেউ বিদেশে থাকেন। বছরের পর বছর অনেকের সঙ্গে দেখা হয় না। কিন্তু ঈদ এলেই গ্রামের সেই পুরোনো মাঠ বা চায়ের দোকান আবার ভরে ওঠে পরিচিত মুখে। কেউ আগের মতোই হাসেন। কেউ বদলে গেছেন। কারও মাথায় পাকা চুল উঠেছে। তবু দেখা হওয়ার পর মনে হয় সময় যেন থেমে আছে। তারপর শুরু হয় স্মৃতির গল্প। কে স্কুল পালিয়ে মাঠে খেলতে গিয়েছিল। কে পরীক্ষার আগে খাতা লুকিয়ে রেখেছিল। কে প্রথম প্রেমে পড়েছিল- এসব গল্পে রাত গভীর হয়ে যায়। এই কয়েক ঘণ্টার আড্ডা অনেক সময় পুরো বছরের ক্লান্তি দূর করে দেয়। ঈদের এই পুনর্মিলনী মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, জীবন যত বদলাক কিছু সম্পর্ক কখনো পুরোনো হয় না।

কষ্টের ভেতরেও আনন্দ

ঈদের যাত্রা কখনো সহজ হয় না। টিকিটের জন্য লম্বা লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট। গরমে ক্লান্ত শিশু। ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ মানুষ।
তবু কেউ যাত্রা থামান না। কারণ এই কষ্টের শেষে আছে প্রিয় মানুষের মুখ। বাসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও যখন গ্রামের রাস্তা চোখে পড়ে তখন ক্লান্তি কমে যায়। স্টেশনে নেমে যখন ছোট ভাই এসে ব্যাগটা হাতে নেয়, তখন মনে হয় এত কষ্ট করেও আসাটা ভুল ছিল না।
ঈদের বাড়ি ফেরা আসলে অনুভূতির কাছে হার মানা।

নতুন প্রজন্মের জন্যও জরুরি

এখন অনেক শিশু শহরে বড় হচ্ছে। গ্রামের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কমে যাচ্ছে। ঈদে বাড়ি যাওয়া তাই শুধু আনন্দ নয়। এটা শেকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ারও সময়। দাদা-দাদির গল্প শোনা। পুকুর দেখা। খোলা মাঠে দৌড়ানো। সন্ধ্যায় উঠানে বসে গল্প করা- এসব অভিজ্ঞতা শহরের জীবনে খুব কমই পাওয়া যায়। অনেক বাবা-মা তাই কষ্ট হলেও সন্তানদের নিয়ে বাড়ি যান। কারণ তারা চান সন্তান যেন জানে তার শুরু কোথায়।

সবার হয় না যাওয়া

সবাই অবশ্য বাড়ি যেতে পারেন না। কেউ চাকরির কারণে আটকে যান। কেউ টাকার অভাবে যেতে পারেন না। আবার দেশের বাইরে থাকা মানুষের জন্য ঈদ অনেক সময় নিঃসঙ্গ হয়ে ওঠে। ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। হাসির চেষ্টা হয়। কিন্তু স্ক্রিনের ওপাশের মানুষকে ছুঁয়ে দেখা যায় না। তখন সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে বাড়ির কথা। ঈদে একা থাকা মানুষগুলোই হয়তো সবচেয়ে ভালো বোঝেন বাড়ি কত বড় আশ্রয়ের নাম।

অতঃপর ফিরে আসা

ঈদ শেষ হয়ে যায় খুব দ্রুত। কয়েক দিনের হাসি আর আড্ডা শেষ করে মানুষ আবার ফিরে আসে শহরে। আবার অফিস শুরু হয়। আবার ব্যস্ততা বাড়ে। আবার ছুটতে থাকে জীবন। কিন্তু বুকের ভেতর থেকে যায় কিছু মুহূর্ত। মায়ের মুখ। বাবার হাসি। বন্ধুদের আড্ডা। গ্রামের সন্ধ্যা। ঈদের সকাল। এই স্মৃতিগুলোই হয়তো মানুষকে সারা বছর বাঁচিয়ে রাখে। তাই প্রশ্নটা আসলে “ঈদে বাড়িতে যেতেই হবে?”- এটা নয়। আসল কথা হলো, মানুষ যত দূরেই যাক শেষ পর্যন্ত সে নিজের মানুষগুলোর কাছেই ফিরতে চায়।

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

জনপ্রিয়