রোববার, ০৩ মে ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সাংবাদিকতা : টিকে থাকা ও স্বাধীনতার সংকট

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সাংবাদিকতা : টিকে থাকা ও স্বাধীনতার সংকট

সংগৃহীত

বর্তমান বিশ্বের তথ্য-বাস্তুতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী অংশ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ২০২৬ সালের মে মাসে এই নিবন্ধ যখন লিখছি তখন পৃথিবীর অন্তত সাড়ে পাঁচ’শ কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত।

মানব সমাজের তিনজনের মধ্যে দুইজন এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন এবং নিশ্চিতভাবেই এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওয়াল এখন তাদের কাছে তথ্যপ্রাপ্তির প্রাথমিক সূত্র। যা মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছে তথ্যপ্রাপ্তির বিশ্বস্ত মাধ্যম মূলধারার গণমাধ্যমের প্রতি।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। গণমাধ্যম গবেষণায় রয়টার্স ইন্সটিটিউট ২০২৫ সালে ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট শিরোনামের একটি গবেষণা পরিচালনা করে। যাতে উঠে আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও নেটওয়ার্ক (ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ অন্যান্য) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকদের সংবাদপ্রাপ্তির প্রাথমিক সূত্র হয়ে উঠেছে।

দেশটির অন্তত ৫৪ শতাংশ মানুষ এখন এক্স (টুইটার), ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে তথ্য পেয়ে থাকেন। যেখানে পিছিয়ে পড়েছে মূলধারার গণমাধ্যম টিভি ও সংবাদপত্র। আর এই পরিস্থিতিই বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকতার জন্য তৈরি করেছে নতুন এক বাস্তবতার, নতুন এক সংকটের। যাতে সার্বিকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও টিকে থাকার সামর্থ্য। 

প্রথমেই আসা যাক গণমাধ্যমের টিকে থাকার সামর্থ্যের দিকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আগ্রাসী বিস্তারের এই যুগে টেকসই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা ও টিকে থাকার লক্ষ্যে ইউনেসকো ও ডি-ডব্লিউ একাডেমিয়া নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

প্রতিষ্ঠান দুটির গবেষণালব্ধ কাঠামো অনুযায়ী টেকসই গণমধ্যমের কিছু পূর্ব শর্ত রয়েছে। যেগুলোর মধ্যে অন্যতম রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও পেশাগত দক্ষতাভিত্তিক মাপকাঠি। যেগুলোর ভিত্তিতে গণমাধ্যমের টিকে থাকা নিশ্চিত হয়। এটা বড় পরিসরের একাডেমিক আলোচনা। এই ছোট্ট পরিসরে বিস্তারিতভাবে সেই আলোচনায় যাওয়ার সুযোগ কম। তবে নিশ্চিতভাবেই গণমাধ্যমের অর্থনৈতিক দুর্দশার দিকটি আলোচনার দাবি রাখে।

আদিকাল থেকেই গণমাধ্যমের প্রধান আয়ের উৎস বিজ্ঞাপন। ইউনেসকোর World trends in freedom of expression and media development শিরোনামের গবেষণায় উঠে এসেছে, বর্তমানে মেটা (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটঅ্যাপ), এ্যালফাবেট (গুগল এর সার্ভিসসমূহ) ও অ্যামাজন এখন বিশ্বের বিজ্ঞাপন বাজারের ৫০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে।

সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য জবাবদিহিতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। আবার সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য গণমাধ্যম অপরিহার্য। কারণ গণমাধ্যম হলো একটি সমাজে সর্বজনীন মানবাধিকার ও ভোটাধিকারের রক্ষাকবচ।

২০২৫ সালে এই তিন কোম্পানি সম্মিলিতভাবে প্রায় ৫২৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। যা ২০২৬ সালে বৃদ্ধি পেয়ে বিশ্বব্যাপী মোট বিজ্ঞাপন ব্যয়ের ৫৬ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। এর অর্থ দাঁড়ায় সনাতন সংবাদমাধ্যমের জন্য বিজ্ঞাপন বাজার মারাত্মকভাবে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে।

যা তৈরি করেছে মারাত্মক হুমকি ও নতুন প্রতিযোগিতার। আর এই প্রতিযোগিতা হলো ডিজিটাল বিশ্বের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ও প্রযুক্তিগত সামর্থ্য অর্জনের। যে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের গণমাধ্যম মোটামুটি খাবি খাচ্ছে।

সারাবিশ্বে সাংবাদিকতার টিকে থাকার থেকে আরেকটি মানদণ্ড নিয়ে আলোচনা না করলেই নয়। সেটি হলো রাজনৈতিক অবস্থা। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন গণতন্ত্রের সাথে সাংবাদিকতার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য জবাবদিহিতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। আবার সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য গণমাধ্যম অপরিহার্য। কারণ গণমাধ্যম হলো একটি সমাজে সর্বজনীন মানবাধিকার ও ভোটাধিকারের রক্ষাকবচ।

২০২৬ সালে রিপোটার্স উইদাউট বর্ডার (আরএসএফ) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ১৮০ দেশের মধ্যে ১০০টি দেশেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিম্নমুখী। আর এর প্রধান কারণ গণতন্ত্রহীনতা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ।

সংস্থাটির সবশেষ প্রতিবেদন বলছে, ২৫ বছরের মধ্যে সার্বিকভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। যাকে সংস্থাটি চিহ্নিত করেছে গণমাধ্যমের খুবই কঠিন ও খুবই খারাপ অবস্থা হিসেবে। যা তৈরি করেছে নানামুখী হুমকি ও সংকট।  

এছাড়া সারাবিশ্বের কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলো সাংবাদিকতাকে অপরাধমূলক কাজ হিসেবে সাব্যস্ত করছে। যা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এতে বাড়ছে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও হত্যার মতো ঘটনা।

আরএসএফ এর তথ্য অনুযায়ী, দল নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে আছে ভারত। যাদের সাংবাদিকতার স্বাধীনতায় সম্মিলিত অবস্থান ১৫৭-তম। বাংলাদেশের থেকে ৫ ধাপ পেছনে।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র যেখানে পুঁজি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করছে সেখানে বিপরীতে অনেক গুণী সাংবাদিক প্রযুক্তির সাহায্যে নতুন করে মানুষের সামনে হাজির হচ্ছেন। যেমন ভারতের বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক রাভিশ কুমার সাংবাদিকতার স্বাধীনতার প্রশ্নে এনডিটিভি ছাড়তে বাধ্য হলেও বর্তমানে ইউটিউব প্ল্যাটফর্মে তিনি পেশাদার সাংবাদিকতা করছেন। যা কোটি কোটি মানুষ গ্রহণ করেছেন। এই চর্চা বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে।   

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে বর্তমান বিশ্ব গত শতাব্দীর নতুন তথ্য ও যোগাযোগ ধারা থেকে বের হয়ে নয়া মাধ্যমের যুগে প্রবেশ করেছে। যেখানে মাধ্যম বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাগরিকের অবাধ প্রবেশ ও আধেয় ভাগাভাগির স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছে।

যদিও এই অবাধ স্বাধীনতা নতুন আপদ ডেকে এনেছে। যাকে ইউনেসকো অভিহিত করছে অপতথ্যের মহামারির যুগ হিসেবে। যে যুগে ক্লিক ও ভিউয়ের লক্ষ্যে ধাবমান সংবাদমাধ্যমের বিশ্বস্ততা যেমন কমছে ঠিক তেমনি বাড়ছে অপতথ্যজনিত আধেয়। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের নাগরিকরা প্রতিনিয়ত সম্মুখীন হচ্ছেন ডিপফেক, চিপফেক, ছদ্মবেশী সংবাদ, ভুয়া সংবাদ, অপপ্রচারসহ নানা ধরনের ডিজিটাল আধেয়ের।

প্রযুক্তির আগ্রাসী বিকাশে যেমন সাংবাদিকতার নানা দিক সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। ঠিক তেমনি ডিজিটাল যুগের নানা বিষয় থেকে বাঁচতে নতুন করে প্রয়োজন দেখা দিয়েছে সংবাদভিত্তিক সত্য তথ্যের।

সংকটকালে যার পরিমাণ বেড়ে যায় জ্যামিতিক হারে। এছাড়া অপতথ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ফাঁদ তো আছেই। যাতে সারবিশ্বের নাগরিক প্রতারিত হচ্ছেন, আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতির শিকার হয়ে অনেক সময় প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটছে।

প্রযুক্তির আগ্রাসী বিকাশে যেমন সাংবাদিকতার নানা দিক সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। ঠিক তেমনি ডিজিটাল যুগের নানা বিষয় থেকে বাঁচতে নতুন করে প্রয়োজন দেখা দিয়েছে সংবাদভিত্তিক সত্য তথ্যের। যার মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব অপতথ্যের মহামারি।

এই মহামারি রোধে ইউনেসকো, ফ্রি প্রেস আনলিমিটেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একটি নতুন কার্যকর সচেতনতামূলক ট্যাগ লাইন প্রচার করছে দীর্ঘদিন ধরে। যেটি হলো, অপতথ্যের  মহামারি প্রতিরোধের কার্যকর প্রতিষেধক হলো স্বাধীন সাংবাদিকতা।

তাই এ কথা বলতেই হয় স্বাধীনতার সংকট ও টিকের থাকার কঠিন লড়াইয়ের মধ্যেও মহামারি মোকাবিলায় সঠিক তথ্য মানুষের জন্য প্রয়োজন। যা মানুষকে দিতে পারে পেশাদার গণমাধ্যম। বিশ্বব্যাপী এই আবেদন যতদিন থাকবে ততদিন নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সাংবাদিকতা সগৌরবে টিকে থাকবে এ কথা বলাই বাহুল্য।

তথ্যঋণ:

১. 2026 RSF Index: press freedom at a 25-year low (RSF, 2026), Retrieved on 2nd May 2026, https://rsf.org/en/2026-rsf-index-press-freedom-25-year-low?data_type=general&year=2026

২. World trends in freedom of expression and media development: global report 2022/2025; Journalism: shaping a world at peace, (UNESCO, 2026) Retrieved on 2nd May 2026,  https://unesdoc.unesco.org/ark:/48223/pf0000396638/PDF/396638eng.pdf.multi

৩. Overview and key findings of the 2025 Digital News Report, (Reuters Institute, 2026) Retrieved on 2nd May 2026, https://reutersinstitute.politics.ox.ac.uk/digital-news-report/2025/dnr-executive-summary

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

জনপ্রিয়