শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

জাপান-বাংলাদেশ কার্যকর অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব

জাপান-বাংলাদেশ কার্যকর অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব

সংগৃহীত

বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে যখন সব দেশই নিজেদের অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে, বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে এই সংকট কাটাতে যে বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে জ্বালানি সমস্যার সমাধান, বিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিতকরণের উপর, উল্লেখ্য মালয়েশিয়া এবং চীন সফরেও উল্লিখিত বিষয়গুলোর ওপরই সরকারের অধিক মনোযোগ পরিলক্ষিত হয়েছে।

৪ দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয় জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানা‍য়ে তাকাইচির। মধ্যাহ্নভোজের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এই বৈঠক সার্বিকভাবে বাংলাদেশের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছে বলে মনে করা যায়।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে জাপানের। দেশের নানা অবকাঠামো উন্নয়নসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাপান বরাবরই উদারভাবে সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশকে। সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী যে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করছেন সেগুলোর ওপর ভিত্তি করেই তার সাম্প্রতিক সফরগুলো পরিচালিত হয়েছে।

সেদিক দিয়ে তার এবারের জাপান সফরের প্রধান লক্ষ্য ছিল মূলত অধিক হারে জাপানের বিনিয়োগ আকর্ষণ। এর সাথে উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের অপরিহার্যতাকে জাপানের সামনে তুলে ধরে আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা। এদিক দিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি বাংলাদেশের প্রত্যাশাকে পূরণ করেছে।

দুই দেশের সরকার প্রধানের মধ্যকার বৈঠকে ৪টি সমঝোতা স্মারকের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি সহায়তা বাবদ ৩২ কোটি মার্কিন ডলার প্রাপ্তির আশ্বাস। জাপানের পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া উদ্যোগের আওতায় এই জরুরি সহায়তা আমাদের জ্বালানি সংকট নিরসনের মাধ্যমে ভোক্তা পর্যায়ের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকে আরও আকর্ষণীয় করতে পারে।

সেই সাথে মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক জ্বালানি প্রকল্পে জাপানের সহায়তার বিষয়েও নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। সবমিলিয়ে এই সফরে  সরকারি পর্যায়ে ৪টি এবং বেসরকারি পর্যায়ে ১৭টি সমঝোতা স্মারক ছাড়াও ২টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মধ্যে ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ চুক্তি এবং উপকূলীয় নিরাপত্তায় ১৩ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন ডলারের অনুদান চুক্তি রয়েছে।

এই বৈঠকে আগামী পাঁচ বছর সময়ে জাপানের বেসরকারি খাত থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ৬৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের বিষয়ে নিশ্চয়তা এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার এলাকা ছাড়াও আরও কিছু জাপানি শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই বিনিয়োগ দেশের কমপক্ষে ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে, যা বেকার সমস্যা সমাধান এবং আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও অধিক হারে জাপানি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে পারে। দুই দেশের সরকার প্রধানের মধ্যকার এই বৈঠক ঘিরে উভয় দেশের মধ্যে উন্নয়নের নতুন ক্ষেত্রে অন্বেষণের তাগিদ লক্ষণীয় ছিল।

উভয় দেশের সরকার প্রধানই তাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রায় অভিন্ন পোস্ট দিয়েছেন। এক্ষেত্রে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তার পোস্টে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বকে আরও জোরদার করতে বাংলাদেশের আগ্রহের বিষয়টিকে প্রশংসা করে মুক্ত এবং অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল (এফওআইপি) এবং দুই দেশের সহযোগিতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি অঞ্চল বা বিগ-বি উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দুই দেশ একমত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।

সেই সাথে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সংযুক্ত করা বাংলাদেশ জাপানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন সানায়ে তাকাইচি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বাজারে জাপানের পণ্য এবং দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে উৎপাদিত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ থাকবে।

মূলত জাপানের সহায়তায় মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর আলোচিত বিগ-বি’র ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং এটি চালু হওয়ার আগে দুই দেশের মধ্যে এই সম্পর্কের ধারাটি আরও জোরদার হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে জাপানের সহায়তায় বিগ-বি অঞ্চল বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিকভাবেও বিভিন্ন দেশের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করতে সহায়তা ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।  

আরও পড়ুন

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ও শ্রমবাজারে নতুন দিগন্ত

গন্তব্য ইউরোপ : স্বপ্নের হাতছানি ও জীবনের ঝুঁকি

প্রবাসী আয় যখন অর্থনীতির প্রাণশক্তি

সফরের তৃতীয়দিন ২৮ অক্টোবর জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) সাথে জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের এক সংলাপে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জাপানি বিনিয়োগকারীদের আরও অধিক হারে বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে অধিক হারে বিনিয়োগ করার এবং শিল্প কারখানা গড়ে তুলে বাংলাদেশকে একটি বিনিয়োগ হাব হিসেবে গড়ে তুলে বাংলাদেশের মত ক্রমবর্ধমান আভ্যন্তরীণ বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন এবং জানান যে এর মাধ্যমে খুচরা এবং ভারী শিল্প উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণ এবং সুবিধা কাজে লাগিয়ে অন্যান্য দেশেও পণ্য রপ্তানির সুযোগ থাকবে, যার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে অংশীদারীত্বের সম্পর্ক আরও মজবুত হবে।

প্রধানমন্ত্রী জাপানি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে আরও জানান যে ইতিমধ্যে আড়াইহাজারের জাপানি ইকোনমিক জোনে জাপানের গাড়ি নির্মাতা, খুচরা বিক্রেতা এবং কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্ততকারক প্রতিষ্ঠানগুলো কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ জাপানি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থের বাইরেও বাংলাদেশের প্রয়োজন মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

জাপান থেকে প্রতি বছর উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ফিরে আসা শত শত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী প্রযুক্তি খাতে অর্জিত শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এদেশে জাপানি ভাষা শিক্ষায় সরকারের উদ্যোগের কথা জানিয়ে এর মাধ্যমে বাংলাদেশ-জাপানের দক্ষ প্রযুক্তিবিদদের সহায়তায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং রোবোটিকস এবং ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদনে এদেশে একটি আইটি পার্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের অভিপ্রায়ের কথা জানান জাপানি বিনিয়োগকারীদের।

উপরোক্ত উদ্দেশ্যে গ্রাম এবং শহরের মধ্যে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের মাধ্যমে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রত্যন্ত এলাকায় বিনিয়োগকে আরও নিরাপদ করা সম্ভব হবে বলে বাংলাদেশের সরকার প্রধান জানান।

ভবিষ্যতে জাপানের কারিগরি সহযোগিতায় বর্তমানে ঢাকার মেট্রো ট্রেন লাইনের মতো আরও কয়েকটি মেট্রোলাইন এবং ঢাকার সাথে ৬টি বিভাগীয় শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজতর করতে বুলেট ট্রেন চালু করার আগ্রহের কথা জানান।

এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের শ্রমবাজার ছিল মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরমুখী। জাপান-বাংলাদেশ উভয় দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রশিক্ষিত কর্মীদের জাপানে প্রেরণ এবং সেদেশের সমতুল্য পারিশ্রমিক প্রদানে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যার কপি এবারের প্রধানমন্ত্রীর সফরে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

মেমোরেন্ডাম অব কো-অপারেশন অন এমপ্লয়মেন্ট স্কিলস ডেভেলপমেন্ট (ইসডিপি-এমওসি) নামে এই সমঝোতার আওতায় আগামী এপ্রিল থেকে জাপানে প্রশিক্ষিত বাংলাদেশী কর্মী পাঠানো শুরু হবে বলে জাপানকে আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ১০ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেশের বেকার তরুণদের উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনশক্তির একটি অন্যতম গন্তব্য হতে পারে জাপান।

বৈশ্বিক অর্থনীতির নানা সংকটে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর বহুপক্ষীয় সম্পর্ক তৈরিতে বাংলাদেশ ভৌগলিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার কার্যকর সংযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোগস্থল, এটিকে কাজে লাগিয়ে পূর্ব এশিয়ার শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ চীন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় সরকারের মনোযোগ এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি দরকষাকষির জায়গায় আমাদের নিয়ে যেতে পারে।

এর মধ্য দিয়ে সত্যিকার অর্থে অর্থনৈতিক নির্ভরতার বৃত্ত থেকে বের হয়ে মর্যাদার জায়গায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

জনপ্রিয়

সর্বশেষ:

শিরোনাম: