শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

ঈদে এক পল্লিতে ৩০০ কোটি টাকার পোশাক বিক্রির টার্গেট

ঈদে এক পল্লিতে ৩০০ কোটি টাকার পোশাক বিক্রির টার্গেট

সংগৃহীত

রেডিমেড পোশাকপল্লী হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে মুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলার সিপাহিপাড়া, বজ্রযোগিনী ও শাঁখারিবাজার এলাকা। উন্নতমানের কাপড় দিয়ে নানা রঙ ও ডিজাইনের পোশাক তৈরি হচ্ছে সেখানে।

এখানে রয়েছে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি পোশাক তৈরির ক্ষুদ্র কারখানা। এ বছর রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে ৩০০ কোটি টাকার পোশাক বিক্রির টার্গেট এই পল্লিতে। পোশাক তৈরিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন সেখানকার কারিগররা।

ঢাকার অদূরে মুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভার শাঁখারিবাজার, গোয়ালঘুন্নী, দর্গা বাড়ি, কাঁঠালতলা, রামপাল ইউনিয়নের সিপাহিপাড়া, সুখবাসপুর ও পঞ্চসার ইউনিয়নের তেলেরবিল, রামেরগাঁও, ভট্টাচার্যেরবাগ গ্রাম। এসব গ্রামের প্রতিটি বাড়ি যেন এক একটি ক্ষুদ্র পোশাক কারখানা। ঈদকে সামনে রেখে গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই এখন বাহারি রঙয়ের পোশাক তৈরি হচ্ছে রাতদিন। এখানকার তৈরি পোশাক ঢাকার সদরঘাট, কেরানীগঞ্জের কালীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের বড় বড় পাইকারি মার্কেট হয়ে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিপণীবিতানগুলোতে।

পোশাক তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররারামপাল ইউনিয়নের সুখবাসপুর এলাকার পলি মিনি গার্মেন্টসের কাটিং মাস্টার মাহবুব লিটন জানান, এই এলাকার মধ্যে দর্জির কারখানা প্রায় প্রতি ঘরে। ঈদ এলে আমাদের কর্মব্যস্ততা অনেক বেড়ে যায়। ভারতের কিছু স্যাম্পল এনে কাটিং করে সেগুলো তৈরি করা হয়। আমাদের অর্ডার নেওয়ার সময় প্রায় শেষের দিকে। রোজার ২৭ পর্যন্ত চলবে আমাদের এই কর্মব্যস্ততা।

পলি ক্ষুদ্র গার্মেন্টসের সেলাই কারিগর জসিম উদ্দিন জানান, নায়রা, পাটি, জর্জঝেট, আলেয়া, বাদুরসহ এইসব মালের চাহিদা বেশি। তিন-চার মাস যাবৎ পাইকাররা এই মালের অর্ডার দিচ্ছেন। তাই আমরা এই মাল তৈরি করছি। আমাদের অনেক পাইকার আসেন যশোর, চট্টগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা থেকে। এই মালের এত চাহিদা যে অনেক পাইকার এসে ফেরত গেছেন।

ঢাকা থেকে কাপড় এনে তৈরি করে নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ এলাকায় নিয়ে পাইকারি দামে বিক্রি করেন তারারাসেল ক্ষুদ্র গার্মেন্টসের কারিগর মাহমুদুল হাসান জানান, রাজধানী ঢাকা থেকে কাপড় এনে তৈরি করে নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ এলাকায় নিয়ে পাইকারি দামে বিক্রি করছি। আর সেখান থেকে অনেক পাইকার নিয়ে যায় দেশের বিভিন্ন জেলায়। এখন আমাদের কাজের অনেক চাপ। সকাল ১০টায় কাজ শুরু করি দুপুর ২টায় গোসল করে আবার ৪টায় বসি, একবারে সেহরি পর্যন্ত কাজ করতে হয়। আমরা প্রডাকশনে কাজ করি। এবার ঈদ সিজনে ৪ মাস কাজ করেছি। আশা করি ২ লাখ থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা পাবো।

রাসেল ক্ষুদ্র গার্মেন্টসের আরেক কারিগর সুজন মিয়া জানান, এখন রোজার ঈদের সিজন‑ তাই কাজের চাপও বেশি। আমাদের এখানকার পোশাকের চাহিদা বেশি থাকায় দিনে ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে। সেহরি খেয়ে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে সকাল ১০টায় থেকে কাজ করি।পোশাককে বর্ণিল করতে কারিগররা নিপুণ হাতে যুক্ত করছেন রঙ-বেরঙের লেইস ও পুঁতি

এই পোশাক পল্লিতে কম্পিউটারাইজড অ্যামব্রয়ডারি মেশিন দিয়ে নানা রকম নান্দনিক কারুকাজ করা হয়। পোশাককে বর্ণিল করতে কারিগররা নিপুণ হাতে যুক্ত করছেন রঙ-বেরঙের লেইস ও পুঁতি। কাপড় কাটা, সেলাই, ডিজাইন নিয়ে এখন দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা।

শাঁখারিবাজার এলাকার তারিব অ্যামব্রয়ডারি অ্যান্ড বুটিক হাউজের টেকনিশিয়ান আরিফ হোসেন জানান, আমাদের এখানে কম্পিউটার দিয়ে অ্যামব্রয়ডারি কাজ হয়। এই কাজগুলো নিয়ে আসে দর্জি কারখানার কারিগররা। আমাদের কাছে ডিজাইন ও কাপড় নিয়ে আসে, আমরা ডিজাইন করে দেই। পরে তারা এগুলো নিয়ে থ্রি-পিস, বাচ্চাদের জামা, লেহেঙ্গা, শাড়ি তৈরি করে মার্কেটে বিক্রি করে। এর মধ্যে সুতার অনেক কালার আছে। আবার সুতাও তিন চার ধরনের। যেমন‑ জরি, মাল্টি, সাধারণ‑ এসব দিয়ে কাজ করি। এখন ঈদের কাজের অনেক চাপ।

মিরকাদিম পৌরসভার শাঁখারিবাজার এলাকার দিবা ফ্যাশন হাউজের মালিক নজরুল ইসলাম জানান, আমাদের পূর্বপুরুষরা এই কাজের সাথে জড়িত ছিল প্রায় ৫০-৬০ বছর আগে থেকে। তাদের দেখে দেখে এখন আমরাও এই কাজ শিখেছি। রেডিমেড কারখানাগুলো মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্য। এখানে আমরা পোশাক তৈরি করে নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ, ঢাকার সদরঘাট ও কেরানীগঞ্জ কালীগঞ্জে পাইকারি দামে বিক্রি করি। কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, নড়াইল, যশোর, খুলনা, বরিশাল, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকাররা এখানে এসে কাপড় কিনে নিয়ে যায়।

আমাদের মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী এই পোশাক কারখানার সুনাম আছে দেশজুড়ে। এখন চলছে ঈদের শেষ সময়ের পোশাক তৈরির ব্যস্ততা। নায়রা, সুতি কটন, নেটসহ বিভিন্ন ডিজাইনের পোশাক তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের এবারের ঈদে ৪০ লাখ টাকার মালামাল বিক্রির টার্গেট রয়েছে।

এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ বিসিক কার্যালয়ের উপ-ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এই পোশাক পল্লিতে অন্তত ৩০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ ধারাটি অব্যাহত থাকলে এক সময় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ছোট ছোট গার্মেন্টস। যেটাকে আমরা মিনি গার্মেন্টস বলে থাকি। এর মধ্যে রয়েছে মিরকাদিম পৌরসভার বজ্রযোগিনী ইউনিয়ন, রামপাল ইউনিয়ন ও পঞ্চসার ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে এই মিনি গার্মেন্টসগুলো। নিজেদের পরিবারের বসবাসের জন্য ছোট ঘরের ভেতরে তারা ছোট পরিসরে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সব মিলিয়ে অন্তত দুই থেকে আড়াই হাজার এমন কারখানা রয়েছে। তাদের উৎপাদিত পণ্যের যে গুণগত মান তা অত্যন্ত চমৎকার। বিশেষ করে বিভিন্ন মৌসুমে তারা এই পণ্যগুলো টার্গেট করে থাকে। দেশব্যাপী তাদের ব্যবসায় রয়েছে।

ঈদের মৌসুমে তারা উৎপাদন বাড়ায় এবং সারা বাংলাদেশে তাদের পণ্য বিপণন করে থাকে। আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এই দুই থেকে আড়াই হাজার কারখানার মোট বিক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় তিনশত কোটি টাকা। তাদের উৎপাদিত পণ্যগুলোর মান অত্যন্ত চমৎকার। বিশেষ করে শিশুদের বিভিন্ন রঙের উন্নত ডিজাইনের নকশা করা যে পণ্যগুলো রয়েছে এর চাহিদা দেশব্যাপী। আমাদের উদ্যোক্তারা নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন মোকামে এই পণ্যগুলো পাইকারি বিক্রি করে থাকে।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে তাদের ব্যবসার পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো। তাদের ব্যবসার যে ধারাবাহিকতা রয়েছে, উন্নত ডিজাইন, বিপণন ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন ব্যবস্থাপনাসহ মার্কেটিংয়ের সকল কিছু যথাযথভাবে সম্পাদন করতে পারলে আসন্ন ঈদে যে টার্গেট সেটি তারা বাস্তবায়ন করতে পারবেন বলে আমি মনে করি। এতে তারা আর্থিকভাবে যেমন লাভবান হবেন তাদের পরিবারও স্বাবলম্বী হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে। আমাদের বিসিকের পক্ষ থেকে তাদের সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। যেমন‑ তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান, ঋণ প্রদান এবং তাদের বিপণনের জন্য সার্বিক সহযোগিতা করে থাকি।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

সর্বশেষ: