শনিবার, ২০ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১

সাহাবি সুহাইব (রা.)-এর আত্মত্যাগ

সাহাবি সুহাইব (রা.)-এর আত্মত্যাগ

ইসলামের সূচনালগ্নে যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছেন, নবীজি (সা.)-এর সঙ্গ দিয়েছেন এবং ইসলাম গ্রহণ করায় কাফেরদের জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হজরত সুহাইব আর-রুমি (রা.)। তাঁর উপনাম ছিল ইয়াহইয়া। বাবার নাম সিনান ও মায়ের নাম সালমা বিনতে কুআইদ; তামীম গোত্রের মেয়ে।

আরবের সন্তান হয়েও তাঁকে ‘রুমি’ (রোমের অধিবাসী) বলার কারণ হলো, তিনি দাস হয়ে কিছুকাল রোমে ছিলেন। সে হিসেবে তাঁকে রুমি বলা হয়। রোমে থাকাকালীন সুহাইব (রা.) জনৈক গণক থেকে শেষ নবীর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী শুনেছিলেন। মক্কায় আসার পর সে কথা বারবার তাঁর অন্তরকে নাড়া দিতে থাকল। ব্যবসার ব্যস্ততার মধ্যেও ভাবতেন, কবে, কিভাবে সাক্ষাৎ লাভ করবেন শেষ নবীর। বেশি দিন যায়নি। হঠাৎ শুনতে পেলেন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ নবুয়ত লাভ করেছেন। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর প্রতি আহ্বান করছেন। অন্যায়-অবিচার ও জুলুম-নির্যাতন ইত্যাদি থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন। মানুষকে জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে? লোকে যাঁকে ‘আল-আমিন’ বলে, তিনিই? লোকজন বলল, হ্যাঁ। জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় তাঁর অবস্থান? তারা বলল, সাফা পাহাড়ের কাছে দারুল আরকামে।

সুহাইব একদিন অতি সতর্কতার সঙ্গে পথ ধরলেন, দারুল আরকামের; রাসুল (সা.)-এর সাক্ষাতের বাসনা নিয়ে। সেখানে গিয়ে দেখেন বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর পূর্বপরিচিত ‘আম্মার ইবনে ইয়াসির’। জিজ্ঞেস করলেন,

—আম্মার, এখানে কোন উদ্দেশ্যে?

—আরে, তুমি কোন উদ্দেশ্যে? পাল্টা প্রশ্ন আম্মারের।

—এই লোকটির কাছে যেতে চাই এবং তার কিছু কথা শুনতে চাই। মনের কথাটা খোলাখুলি বলে দিলেন সুহাইব। আম্মারও নিজের কথা আর গোপন রাখলেন না। বললেন,

—আমারও উদ্দেশ্য তাই। তাহলে আর দেরি কেন, চলো, ভেতরে যাই।

দুজন ভেতরে গেলেন। রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে কথাবার্তা বলে একসঙ্গে হাত বাড়িয়ে দিলেন এবং কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলেন। সুহাইব (রা.) বলেন, সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা সেখানে থাকলাম। রাত যখন অন্ধকার ছড়িয়ে দিল, আমরা চুপিসারে সেখান থেকে বেরিয়ে নিজ নিজ অবস্থানে চলে গেলাম। তখন পর্যন্ত ত্রিশেরও বেশি সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

সুহাইব তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রাখলেন না; প্রকাশ করে দিলেন। আম্মার, বিলাল, সুমাইয়া প্রমুখ সাহাবির ন্যায় তিনিও কুরাইশদের নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হন। (রিজালুন হাওলার রাসুল ১/৯৬) তিনি ছিলেন রাসুল (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ প্রবীণ সাহাবি। তিনি একটু রসিক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, তাঁর কথায় নবীজি (সা.) মাঝেমধ্যে হেসে উঠতেন। আবার ইসলামের জন্য ময়দানেও যুদ্ধ করেছেন বীরের বেশে। রাসুল (সা.)-এর হিজরতের পরপরই হিজরত করেন এবং তাঁর সঙ্গে সব যুদ্ধে যোগদান করেন।

সুহাইব (রা.)-এর সঙ্গে উমার (রা.)-এর সম্পর্ক ছিল খুব ভালো। তাঁর যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতায় উমার ছিলেন মুগ্ধ। তিনি আহত অবস্থায় অন্তিম শয্যায় যখন পরবর্তী খলিফা নির্বাচন বিষয়ে ছয় সদস্যবিশিষ্ট শুরা কমিটি গঠন করে যান, তখন সুহাইব (রা.)-এর ব্যাপারে অসিয়ত করলেন যে নতুন খলিফার নাম ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত তিনিই খেলাফতের দায়িত্ব পালন করবেন। খলিফার জানাজাও তিনি পড়াবেন। অসিয়ত অনুযায়ী সুহাইব (রা.) উমার (রা.)-এর জানাজা পড়ান এবং তিন দিন পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। (আত-তাবাকাত ৩/১৭৩, উসদুল গাবাহ : ২/৪২১, রিজালুন হাওলার রাসুল : ১/৯৯) তিনি ৩৮ হিজরি সনে মদিনায় ইন্তেকাল করেন।

দৈনিক বগুড়া

সর্বশেষ: